Sunday, April 6, 2008

মুনিরা-২

মুনীরা মুজাফফরের সামনে সাধারনত যেতে লজ্জা করে । কিন্তু তখন না গেলেও চলেনা । একটা ছুতো নিয়ে খসরুর খোঁজে এসে ভাবীর কাছে দাঁড়াতেই মুজাফফর শুধিয়েছেন, মুনিরে, আয় খেয়ে নে।


আমিতো খেয়েছি ভাইজান। ভাবী আমাকে আগেই খাইয়ে দিয়েছেন। সুযোগ পেয়েই সে বলে ফেলেছে সত্য কথাটি।

ভাবীর উপর ভাইজান কি যে খুশি হয়েছেন! মুনীরা মুজাফফরের চোখ দেখেই তা টের পেয়েছে ।

সেই স্নেহ শীল মানুষটিকে মাহতাব তুচছ তুচছ করে কথা বলে । শুনে মনটা ওর মাঝে মাঝে একবারে তেতো হয়ে যায় । চল আমরা এক চক্কর মার্কেট থেকে ঘুরে আসি ।


মুনীরা হাত ধরে মাহতাবের সাথে মার্কেটের দিকে এগুলো ।
প্রথমে একটা জুতোর দোকান । একজন মহিলা তার স্বামীর সাথে জুতো কেনার জন্যে দোকানে ঢুকেছেন । মহিলাটির বয়স মোটামুটি কম নয় । চল্লিশ - পঁয়তাল্লিশ হবে সারা শরীর নিদারুন বসন -কার্পন্য । মোটাসোটা শরীর যথেষ্ট মেদ জমেছে । সেই মেদবহুল দেহে ছোট্ট একটা ভয়েলের ব্লাউজ । ডানা কাটা। পিঠ ও পেট উদোম । শরীরের ফিন ফিনে কাপড়টি আলুলায়িত । খোলা মাথা । খোঁপায় মস্ত বড় একটা আটিফিসিয়াল গন্ধরাজ । মুনীরার ঘৃনা লাগছে ওকে দেখে । মেয়ে মানুষ হাবিয়া দোযখের ভয় করেনা ?


মাহতাব ওকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, কী দেখছে অমন হাঁ করে ?

- কিছু না ।

- কিছু না নয়, একটা যে কিছু দেখছ তা কি আর আমি বুঝতে পারি না ?

- কী বুঝতে পারো ?

তুমি দেখেছ ঐ মহিলাটিকে । ঠিক না ? মফস্মল শহর থেকে এসেছ কিনা চোখে তাই ধাঁধাঁ লাগছে । ঐ বুড়ো মেয়ে মানুষটি যদি অমন সুন্দর করে নিজেকে সাজাতে পারে তোমার সাজতে বাধাটা কোথায় শুনি ?

মুনীরা সে কথায় জবাব না দিয়ে বলল, কোথাও বসার জায়গা নেই গো? মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করেছে । একটু বসতে পারলে বোধ হয় ভাল হত ।

-তাহলে চলো ঐ রেস্টুরেন্টে । একটা কোক খেয়ে নেবে । শরীরটা আবার ফ্রেশ হয়ে যাবে ।

মুনীরাকে প্রায় টেনে নিয়ে মাহতাব সামনের একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল । জন তিনেক ছোকরার সাথে একটি তরুণী সমানে হাত নেড়ে কথা বলছে। সামনে ওদের খাবার প্লেট । দুএকবার মুখে দিচ্ছে , মাঝে মাঝে বেমক্কা হাসিতে ফেটে পড়ছে ।
মুনীরা এসে থমকে দাড়াল । বলল এখানে নয়, অন্য কোথাও চল ।


এত খোলামেলা জায়গায় আমি বসতে পারবনা ।

-আরে কি মুশকিল ! তোমাদের মতন কুনোব্যাঙের জন্যে ও হোটেল-অলার ‌নজর আছে দেখছো না ? ঐ যে কেবিন বানিয়ে রেখেছে, ওখানে চলো গোপনে বসা যাবে। কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না ।

কেবিনে ঢুকে মুনীরা হাফ ছেড়ে বাঁচল । মাহতাব সুইচ টিপে মাথার ওপর পাখাটা চালিয়ে দিল । শরীরে বাতাস লাগতেই মুনীরা আঃ বলে একটা আরাম সূচক ধ্বনি করে উঠল ।

ঠিক সেই সময় একজন জোয়ান মরদ মানুষ মুনীরার পাশে এসে দাঁড়াল । ওর হাতে খাবারের মেনু । মাহতাব বলল চিকেন ফ্রাই হবে ?

- জ্বী হাঁ । আর কী দেব স্যার ?

- আর কোল্ড ড্রিন্কস-কোক ।

ঘরটাকে কেমন আলো আধাঁর ছায়াচ্ছন্নতা । ছাদের সাথে সাথে লেগে আছে এখানে সেখানে সবুজ - গোলাপী আলোর বালব । তার নিষ্প্রভ আলো ঘরটাকে কেমন আলো আধাঁরিতে রহস্যময় করে তুলছে । একটা লাল মুখো গাব্দা লোক বুক সমান অর্ধ বৃত্তাকার টেবিলের ওপাশে বসে যেন মিট মিট করে তাকাচ্ছে । মুনীরার সিট থেকে লোকটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ।

লোকটার কাছ থেকে খুব ভারী আর লো সাউন্ডে একটি গান বেজে চলছে । খাবার আসার আগ পর্যন্ত গানের সুরে সুরে মাহতাব টেবিলের ওপর ঘন ঘন চাটি দিতে লাগল।


- এখন কেমন লাগছে তোমার ? মাহতাব আবার প্রশ্ন করল ।

- ভালই তো । কতকটা নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল মুনীরা ।

- থামো না, আরো ভাল লাগবে । ধীরে ধীরে যখন অভ্যেসটা হয়ে উঠবে না? তখন দেখবে তুমিই আমাকে এখানে আসার জন্যে ঠেলছো । টাইম ইজ দ্যা বেষ্ট কীলার।

মুনীরা কথাগুলি নীরবে শুনে গেল। কোন জবাব দিল না ।


ওয়েটার একখানি প্লেটে খুব কড়া করে ভাজা কয়েক টুকরা মুরগীর কাবাব দিয়ে গেল। মাহতাব বলল নাও শুরু কর ।
মুনীরা আপিত্ত করে বলল আমার কোন কিছুই খেতে মন চাইছে না ।


তুমি খেয়ে নাও, বরং আমি একটু কোকাকোলা খেয়ে দেখি, অস্বস্তিটা যায় কি না ।

- আরো নাও নাও । একটা তো নেবে। তার পর ভাল না লাগলে খেও না ।

মুনীরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক টুকরা চিকেন তুলে কামড় দিল । সামান্য সামান্য গরম আছে । বেশ মচমচে ।

মুনীরা কে খেতে দেখে মাহতাব জিজ্ঞেস করল কেমন লাগছে ?

- ভাল ।

তবে আরো দু এক টুকরা খাও ।

- কিন্তু আমি যে খেতেই পারছি না।

- তবে থাক। বলে একজন ওয়েটার কে ডেকে বলে দিল, এক বোতল কোক আগে দাও তো ভাই । একটু কোকা কোলা স্ট্রর ভেতর টেনে নিয়ে, মুনিরা ফুঁদিয়ে ফেলে দিল । ময়লা টয়লা থাকলে পরিস্কার হয়ে যায় । তারপর মৃদু মৃদু চুমক দিয়ে ধীরে ধীরে বোতলের অর্ধেকটা সে শেষ করে ফেলল । তারপর কী ভেবে একটু হেসে উঠে বলল, এই সব কোল্ড বিভারেজও আমার পছন্দ হয় না ।

মাহতাব চোখ গুলি বড় বড় করে বলল , কেন ? ওতে নেশা টেশা হয় নাকি ?

- নাগো না । তা নয় ।

- তবে ?

- এটা কোথায় তৈরী হয় জানো ?

- কেন, তেজগাঁতে ?

- তেজগাঁতে তো কেবল পানি মেশানো হয়। আসল জিনিস টা কোথা থেকে আসে তা জানো ?

মাহতাব অবাক হয়ে মুনীরার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল কোথা থেকে আসে?

- আসে আমেরিকা থেকে ।

- ওরে বাপরে, অনেক খোজ খবর রাখো দেখছি , কিন্তু তাতে কী হয়েছে ?

তুমি কী সত্যি জানো না, এটা আমেরিকান ঈহুদীদের একটি পন্য সামগ্রী ? একশো বছর ধরে এক চেটিয়া ভাবে এই রকম পন্য দিয়ে টাকা লুটে ফিলিস্তিনী মুসলমানদের মাথায় ওরা বোমা মারছে । সত্যি তুমি জানো না ?

- মুনীরা এই জ্ঞানের বহর দেখে মাহতাব অবাক হয়ে গেল। কিন্তু সেটা গোপন করে বলল, ও তোমাদের আবার মুসলমান মুসলমান করার একটা রোগ আছে কিনা !

মুনীরা বলল, তোমার ?

- আমার? আমারটা তো তুমি জানোই ! আই লাভ মানি ওনলি । আমি মুসলমান ইহুদী বুঝি না ।

মুনীরা মুখ খানি আবার ম্লান হয়ে গেল । সে চুপ করে রইল ।

দুজন বাইরে এসে দাড়াতেই দেখতে পেল আগের সেই পান-দোকানে দাড়িয়ে থাকা তিন জন যুবক হোটেলের সামনে এসে দাড়িয়েছে। ওদের চাহনিটা কেমন বিদঘুটে মনে হচ্ছে । মুনীরাকে আজ প্রথম সাজগোজ করে মাহাতব যখন পথে বার করে, তখন অনেককেই সে লালসা মাখা চোখে মুনীরার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে। মুনীরার রূপ-যৌবনের ঐ সব অবাক অবাক চোখের চাহনিতে মাহতাবের আত্মা-তৃপ্তি লাভ করেছিল । কিন্তু এ চোখ তো সে চোখ নয়। এ দৃস্টির দিকে তাকিয়ে সে বিব্রত হয়ে উঠল ।


একজন ঝাকড়া চুলো রুক্ষ চেহারার যুবক ফস করে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কী একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু অন্য একজন চোঙা প্যান্ট পরা কোমরে বেল্ট বাঁধা লীডার গোছের যুবক খপ করে ওর হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে সরিয়ে নিয়ে বলল একসকিউজ মী স্যার আপনারা যান । বলেই কটকট করে আগের যুবকটার দিকে তাকিয়ে বলল, এই বাঘা ,আয় এদিকে । যেখানে সেখানে ফাজলামী করলে দাঁতের পাটি ফেলে দেব বলে দিলাম । এই লীডার গোছের ছোকরার কথা শুনে বাঘা থতমত খেয়ে একেবারে মিইলে গেল ।


মাহতাব মুনীরাকে নিয়ে কিছু দূর যেতেই দেখল, হোটেলের ভেতর সেই তরুণীকে নিয়ে বসে থাকা তিনজনের দু’জন ছোকরা দৌড়ে ওদের পাশ দিয়ে উর্ধশ্বাসে পলাল। বাকি একটা যুবক আর সেই তরুণী পান দোকানে দাড়ানো দুজন যুবকের নিয়ন্ত্রনে এখন এগিয়ে আসছে। তরুনীর সংগীটির একখানি হাত বাঘার খপ্পরে আটেক পড়ে আছে । সেও হয়ত পালাতে চেয়েছিল । ম্যানেজ করতে পারেনি ।


নিজন একটা শেডের নীচে ওরা সবাই এসে দাঁড়াল । তরুনীটি তড়তড় করে হাত নেড়ে বলছে , হীরু ভাই । ওরা দুজন পালালে ওদের তোমরা পাবে ।

বাছাধনরা পালিয়ে যাবে কোথায় ?

দলপতি হীরু চাপা গলায় বলল ফ্যাচ ফ্যাচ করিস নিমুখপুড়ি । গায়ে তোর আগুন লাগিয়ে দেব পেট্রোল ঢেলে ।
মেয়ে টি সে কথা শুনে ভয় পেয়েছে বলে মনে হয় না । বরং হেসে উঠে বলল তাই দাও না মিটে যাক । কিন্তু তুমি আমার দোষটা কোথায় পেলে তাই শুনি ?

- দোষ নয় ? আমরা গিয়ে দেখি তুই বেরিয়ে এসেছিস । আসবিই যদি তো কথা দিয়েছিস ক্যান ? এখন পার্টির কাছে আমাকে মাথা হেট করতে হচ্ছে শুধু কি তাই এক হাজার টাকার মত আমার গচ্চা যাচ্ছে।

--ত্যাবড়া যে বলল সে নাকি তোমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে ? তুমি রাজি আছ ? আমি না জেনে শুনে কি আর নাইট শোতে এমনি এমনি এসেছি ?

-ব্যাটা বলেছে? শালার ব্যাটা শালা যে উন্দো মুন্দে দৌড় দিল হাতে পেলে ধাপ্পা বাজিটা আজ ওর আমি বার করে দিতাম ।

বাঘার হাতে বন্দী ছোকরাটির দিকে তাকিয়ে বলল তুই ও শালা সাথে ছিলি । ছিলি না ?

ছেকরাটি কী যেন বলতে গেল । কিন্তু বলার আগেই বাঘা ধপ করে ওর গালের ওপর একটা ঘুষি লাগিয়ে দিল ।

ঘুষি খেয়ে ছোকরাটি একটু রুক্ষ গলায় বলল দেখ্ বাঘা মুখে ঘুষি মারবি না বলে দিলাম !

মুখে নয় শালার পাছায় মার । দলপতি ছোকরাটিকে গদাম করে ওর কোমর বরাবর কষের একটা লাথি মারল ।

লাথি খেয়ে ছোকরাটি ককিয়ে উঠল আর উচ্চবাচ্চ্য করলনা । মেয়েটি বলল যা হবার তা হয়ে গেয়ে হীরু ভাই । এখন তা নিয়ে আর; মারপিট করে লাভ নেই। এখন কী করলে ভাল হয় তাই কর ।

দে এক হাজার টাকা। দলপতি হীরু বলল ।

এ-ক হাজার ? অত টাকা আমি কোথায় পাব ? ইয়ে করে দিবি? বলে হীরু একটা বিশ্রী উক্তি করল ।

অত টাকা কে আমাকে দেয়? তুমি দিয়েছ কখনো ?

- শুধু লিপষ্টিক নিয়েই ছেড়ে দাও তাই না ? গালের ওপর কষে থাপ্পড় লাগব । আমাকে বিপদে ফেলে এখন ভালভালানি দেখানো হচ্ছে ।

মেয়েটি হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল । ওর চোখে পানি এসে গেছে !

হীরু বলল কাঁদবিনে বলে দিলাম । ভাল চাসতো চল আমার সাথে । দেখি পাটি যদি রাজি থাকে তাহলে একটা হিল্লে হবে। যাবি ?

তরুণী চোখ মুছে বলল চলো ।

এই বাঘা শিগগীর একটা স্কুটার ডাক ।

একটা স্কুটার এসে দাড়াঁতেই ওরা সবাই হুড় মুড় করে উঠে পড়ল । হীরু বাঘার হাত থেকে ঐ ছোকরাটিকে কেড়ে নিয়ে তার পাছার ওপর আর একটি লাথি মেরে বলল, ভাগ শালার বাটা শালা ।

ছোকরাটি ছাড়া পেয়ে দিল এক ছুট ।

পাশেই একজন বন্দুকধারী দাঁড়িয়ে ছিল । গোটা ঘটনাটি দেখে সে বেচারী মুচকি মুচকি হাসতে লাগল ।

মুনীরা মাহতাবের হাতে কষে একটা ঝাকনি দিয়ে বলল, ওরকম হাঁ করে দেখছ কি? চলো।

মাহতাবের হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরে এসেছে। অস্ফুটে বলল, মাইট ইজ রাইট !

সিনেমা হল এর ভেতর ততক্ষনে বাতি সব নিবে গেছে । বিরাট পদার ওপর তখন স্হানীয় প্যনের লাগাতার স্লাইডে উলঙ্গ বাহার মেয়ে মানুষের ছবি দেখে মুনীরা অস্ফুটে বলল হায় আল্লাহ ! বলেই একবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল ।

শব্দটি মাহতাবের কানে পৌঁছতেই সে বলে উঠল, হলের মধ্যে আবার তোমার আল্লাহ কখন ঢুকল? রাগে ক্ষোভে মুনীরার সর্বাঙ্গ তখন রি রি করে জ্বলছে। সে ভাবছে সবই মাহতাবের বিদ্রোহ। মানুষ ছোট থেকে হঠাৎ বড় হলে বোধকরি এইরকমই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে ।

মুনীরাকে চুপ করে থাকতে দেখে মাহতাব বলল কী হল তোমার ?

- না কিছুই হয় নি । আমার শরীরটা ভাল লাগছে না ।

- প্রথম প্রথম কিনা তাই। একটা অভ্যাস করলেই তখন দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে ।

- সিনেমার ঐ ইল্লৎ মেয়ে মানুষ গুলো দেখে আমার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে ।

- কই সিনেমা ? আসল সিনেমা তো এখনো শুরুই হয়নি । তখন বোধকরি পিত্তিটা তোমার পুড়ে ছাই ই হয়ে যাবে।
মাহতাব বলে উঠল এই যে এবার মেইন ছবি শুরু হয়ে গেছে ।

মুনীরা তাকিয়ে দেখল পর্দার ওপর অনেক গুলি নাম একটার পর একটা আসছে আর চলে যাচ্ছে । হল ঘর এখন নিস্তব্ধ।
নামগুলি শেষ হতেই একটি আঠারো বিশ বছরের যুবতী বেদম নাচতে শুরু করল।

মুনীরা ছবি দেখার পরিবর্তে মাহতাবের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল আধারের মধ্যে ওর চোখ দুটি ঐ নাচ দেখে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে ।

হঠাৎ কী যেন ঘটে গেল। কোথা থেকে চো করে একটা শিসের তীব্র আওয়াজ উঠল । মুহুর্তে সারা ঘর আনন্দ কোলাহলে একেবারে গম গম হয়ে উঠল। মুনীরা পর্দার দিকে চোখ ফেলেই ছিঃ বলে দৃস্টি নামিয়ে নিল । আর সে তাকাতেই পারছে না । মনে হচ্ছে কেউ যেন ওর দু’চোখ সুচ হয়ে ফুটিয়ে দিচ্ছে ।

জনতার কোলাহল থামলে লেডিজ সিটের দিক থেকে একটা শিশুর চিৎকার শোনা যেতে লাগল । এতক্ষন হাজার হাজার মানুষের অট্রহাস্য ওর কচি কন্ঠের আওয়াজ তলিয়ে গিয়েছিল । এবার সেই আওয়াজ টি তীব্র হয়ে সারা হল ঘরে যেন তড়পাতে লাগল ।

শিশুটির চিৎকারে বিরক্ত হয়ে নিচের তৃতীয় শ্রেনীর দর্শকদের মধ্য থেকে একজন লোক হেড়ে গলায় বলে উঠল আরে দুধ দেও দুধ দেও ।

লোকটির গায়ে-পড়া দরদের কথা শুনে আবার সারাটা হল-এর লোক হো হো করে হেসে উঠল। মানুষের এই দম ফাটা হাসির আওয়াজে দেখা গেল সত্যি সত্যি শিশুটি স্তব্ধ হয়ে গেছে।

মাহতাবের হাতের ধাক্কা খেয়ে মুনীরা ধড়মরিয়ে উঠে বলল, কি গো? কী হয়েছে ?

সারা ঘরে আবার আলো জ্বলে উঠেছে । আশেপাশের দর্শকরা পর্দার ছবি ছেড়ে এবার মুনিরার দিকেই চোখ ফিরিয়েছে। ওর একবার মনে হচ্ছিল কাপড়ের আঁচলটা টেনে নিয়ে নিজের মুখ খানি ঢাকবে । কিন্তু আঁচল কোথায়? মাহতাব যে ওর আঁচলটা একেবারে ছোট করে ফেলেছে। মাহাতাব জিজ্ঞেস করল, কখন তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ?

মুনীরা ক্লান্ত গলায়, বলল, আমার কিছু মনে নেই।

- ছবি একটুও দেখনি তাহলে?

- দেখেছি, দেখতে দেখতেই তো ঘুম এসে গেছে। বলেছিলাম না শরীরটা বড্ডো ক্লান্ত?তুমি তো শুনলে না ।

- এখন তো বিরতি । অর্ধেক বাকি আছে। এখন কী করবে?

- কেন দেখব।

মাহতাব বলল না থাক। আবার তোমার ঘুম এসে যাবে। চল, বাসায় ফিরে যাওয়া যাক।

মুনীরা বিচলিত হয়ে বলল, রাগ করলে?

- না না রাগ করিনি। বুঝতে পারছি সত্যি সত্যি শরীর তোমার ভাল নেই।

স্কুটারে বসে মুনীরার শরীরটা কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগল। হঠাৎ করেই তার বাড়ির কথা মনে পড়েছে । ভাই-ভাবী-খসরুর কথা। ভাইজানের কথাটাই এ মুহুর্তে তার মনের পর্দায় জ্বল জ্বল করে ভেসে উঠেছে । মুনীরা দেখতে পাচ্ছে মুজাফ্ফরের দুটি চোখ থেকে অপরিসীম ঘৃণা ঝরে পড়ছে। মুজাফফর যেন মুনীরার দিকে স্থির হয়ে চেয়ে আছেন। আস্তে আস্তে চোখ দুটি তার বড় হয়ে উঠৈছে । বড় হতে হতে মুনিরার সারা আকাশটা যেন ছেয়ে গেল। তারপর এক সময় মুজাফফরের ঐ বড় বড় চোখ দুটি সেখানেই স্থির হয়ে গেল। মুহুর্ত কাল পরে সেখান থেকে সাহসা দুটি ধারা প্রভাহিত হতে শুরু করল। মুনীরা দেখতে পাচ্ছে ঐদুটি ধারা যেন পৃথিবীর সবচাইতে বড় দুটি জল-প্রপাতকেও হার মানাবে।


ভয়ে মুনীরা মাহতাবের দিকে সরে এলো । মাহতাব বলল, অমন করছ কেন বলত?

- কি জানি গো আমার বড্ডো ভয় করছে।

- ভয়? ভয় কিসের ? মাহতাব মুনীরার গায়ে হাত রাখল। মুনীরার সারা গায়ে দারুণ ঘাম ঝড়ছে।



মাহতাব ডিভেনে হেলান দিয়ে একটি দৈনিকের পাতায় চোখ বুলাচ্ছিল।
মাথার কাছে বেনসন এণ্ড হেজেসের সোনালী প্যাকেটটা পড়ে। হাতের আঙ্গুলে রাখা সিগারেটের শলাটি থেকে এঁকেবেঁকে একটা ধোঁয়া উঠেছে ওপরে।


মুনিরা ঘরে ঢুকল। পরনে ওর কচি কলাপাতা রঙের টাঙ্গাইল শাড়ী।

আধো ভেজা এলো চুল পিঠের উপর কলো মেঘের মতন জমে আছে।

মাহতাবকে একটি নীল খাম এগিয়ে দিয়ে বলল, তোমার চিঠি কাল থেকে লেটার বক্সে পড়ে আছে।

- কে দিয়েছে?

- কি জানি? আমি খুলে দেখিনি।

- দাও, খুলে দাও।

মুনীরা একটান মেরে খামের একটা ধার ছিঁড়ে বলল, নও, ধরো। আমি তোমার চা নিয়ে আসি।

হাতের সিগারেটটা ছাইদানিতে গুজে মাহতাব সোজা হয়ে বসল।

মুনীরা কিচেনে যাচ্ছিল। মাহতাব ডাকল, এই শোন।

ফিরে দাঁড়িয়ে মুনীরা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।

- চিঠি কার জানো? সেই ঘটকের।

- মানে?

- আমাদের বিয়ের ঘটক।

- কে সে? সেই মোক্তার সাহেব?

- আরে না। তুমি যে চিনতেই পারছ না। আমার বন্ধু রওশন। লিবিয়া থেকে লিখেছে।

- কী লিখেছেন? তোমাকে দাওয়াত দিয়েছেন না কি?

- আরে না না। সে বরং দাওয়াত চেয়েছে। রওশন লিবিয়া থেকে চলে আসছে। ওখানে ওর পোষাচ্ছে না। যা বেতন পায়, তার ফর্টি পার্সেন্ট সেই দেশেই আন্ডার কম্পালশন খরচ করতে হয়। পোষাবে কি কচু।

মুনীরা যেতে যেতে বলল, বাংলাদেশে এসে পোষাবে তো?

মুনীরা চলে গেলে মাহতাব চিঠিটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। রওশনের হাতের লেখাটি বেশ সুন্দর। প্রতিটি অক্ষর মুক্তার মত ঝক ঝক করছে।

মুনীরা চায়ের কাপটি টী পটে রেখে ডিভানে বসল।

মাহতাব জিজ্ঞেস করল, তোমার চা কই?

- চা ভাল লাগছে না। এমনি রাত জেগেছি। চা খেলে শরীরটা আমার কড়া হয়ে যায়।

- চায়ে একটু দুধ বেশী দিয়ে নাও। তা হলেই ঠিক হয়ে যাবে।

- মুনীরা উঠে গিয়ে মাহতাবের কথা মত এক কাপ চা নিয়ে ফিরে এসে আগের জায়গায় বসল।

মাহতাব কাপে চুমুক দিয়ে বলল, আজ কোথায় যাবে বল।

- আজ কোথাও যাব না। আজ কষে ঘুম দেব। আমার মনে হয় ঘুমালে আমার ক্লান্তিটা কাটবে।

- তুমি আবার কাল রাত জাগলে কখন? হল-এও তো ঘুমিয়েই পড়েছিলে।

No comments: