মাহতাব পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে রওশনের দিকে এগিয়ে ধরে বলল, উঁহু মেজাজও তার খারাপ নয় ৷ শান্ত-শিষ্টও বটে ৷
- তাহলে ?
মাহতাব কী বলবে মুহুর্ত খানেক খুঁজে পেতে দেখল৷ তারপর বলল, দারূন আনসোশ্যাল ৷ আনসোশ্যাল হবার কারন হচ্ছে, একেবারেই আউট ডেটেড ৷ তার উপর প্রচণ্ড ধর্মান্ধ ৷
- মানে ?
কোন পুরুষ মানুষের সামনে ওকে ক্রেন লাগিয়ে টেনে বার করা যায় না ৷
ও ৷
- দেখিস তোর সামনেও সে আসবে না ৷
- বেশ ভালই তো৷
মাহতাব বলল, ভাল না ছাই ৷ তোর বৌ নেই, তুই বুঝবি না ৷ বন্ধু বান্ধবদের তো দেখি ৷ তাদের বৌরা বিনা দ্বিধায় আমাদের সাথে কি সুন্দর মেলামেশা করে ৷ নুরের বৌটা তো আমার সাথে একলা একলা সিনেমায় যাওয়ার জন্যেও নাচে ৷ ভেরি সোশ্যাল গার্ল ৷ একবার জিনিয়ার কথাও এ সময় মাহতাবের ঠোঁটের ডগায় এসে গিয়েছিল ! কোন মতে সামলে নিল ৷
রওশন কে সে জিনিয়ার কথাটা যতদুর সম্ভব গোপন করতে চায় ৷ রওশনেরও তো বিয়ে হয় নি৷ সুদর্শন সুপুরুষ ৷ তার ওপরে জিনিয়া মতনই সুখ্যাত গায়ক ! জিনিয়ার খবরটা রওশন জানতে পারলে আবার কোন জটিলতা সৃষ্টি হয় কে জানে !
রওশন প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, আর দেরি করব না ৷ এবার আমি একটা ঘর বেঁধে ফেলব ৷ ভ্যাগ্যাবণ্ড হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলাম, নৈবচ নৈবচ ৷ দে তো একটা খেঁদির মা-টা ঠিক করে ৷ বিয়ে করে ফেলি ৷ বলে রওশন এক গাল ধোঁয়া ছাড়ল ৷
মাহতাব ভেতরে ভেতরে কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েছিল ৷ বাইরে সেটা প্রকাশ হতে দিল না ৷ বলল, খেঁদির মা নয় রে ৷ তোর একটা ভাল বৌ জোগাড় করে দিচ্ছি, দাঁড়া ৷ আমি এবার সিরিয়াস হব স্থির করেছি ৷
বাসার সামনে গাড়ি থামলে লিলি আর মিলি দু' জন হুড়মুড় করে ছুটে বেরিয়ে এলো ৷
লিলি মিলিরা এয়ার পোর্টে যাবার জন্যে বায়না ধরেছিল ৷ কিন্তু ওদের মার শরীর খারাপ, তাকে দেখা শোনার অজুহাত দেখিয়ে মাহতাব ওদের সঙ্গে নেয়নি ৷ এবার মামাকে পেয়ে ওরা আনন্দে নাচতে লাগল ৷
বিকেলে রওশন মাহতাবের বাসায় এলো ৷ ঘরে ঢুকতেই সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, ভাবী কই-ভাবী ?
ডাক শুনে মুনীরা খুবই বিব্রত হয়ে পড়েছিল ৷ গেন্দাকে ডেকে বলল, ভদ্রলোককে বসতে বল তো গেন্দা ৷ বলিস বিবি সাহেব খুব ব্যস্ত আছে ৷
গেন্দা রওশনের সামনে গিয়ে দাড়াল ৷ আপামণি কাম করতেছেন ৷ অহন আইতে পারব না৷ আপনে বন ৷ কাম সাইরা আইব ৷
মুনীরা বার বার ঘড়ির দিকে তাকাতে লাগল ৷ এক্ষুণি তো মাহতাবের ফেরার কথা ৷ কিন্তু ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন ?
কয়েকটি মুহুর্ত নীরবতার পর বাইরে জুতোর শব্দ শোনা গেল ৷ মুনীরা মাহতাব আসছে ভেবে আশ্বস্ত- হয়ে উঠল ৷ কয়েক মুহুর্তের মধ্যে মাহতাব ও রওশনের গলার আওয়াজে ঘর খানি মুখর হয়ে উঠল ৷
- কিরে কখন এসেছিস ?
- তা আধ ঘন্টা তো হবেই ৷
- একলাই বসে আছিস ?
- নইলে?
- তোকে বলেছিলাম না? আচ্ছা তুই বস আমি আসছি ৷
মাহতাব ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখল, মুনীরা রওশনের চা নাশতা তৈরীর কাজে ব্যস্ত ৷ বলল, রওশন এসে একলা বসে আছে, তুমি গিয়ে ওকে বসতে ও বলনি, এটা কেমন ব্যাপার বল তো!
- আমি না বললেও ওর বসতে অসুবিধা হয়নি৷
- কী বলছ তুমি ?
মুনীরার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়েছিল ৷ বলল, যা বলছি তা তোমার বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় ৷
- তুমি আমার বন্ধু-বান্ধবের কাছে আমাকে খাটো করতে চাও, লজ্জা দিতে চাও কেন বল তো ?
- তুমি বোঝার শক্তি রাখো না বলেই বুঝতে পারোনা ৷ আমি তোমাকে সম্মান করি৷ কারুর কাছে তোমাকে খাটো করতে চাইনা ৷ এটা তোমার যখন বোঝার মত শক্তি নেই, তখন আর বুঝাতে যাব না ৷
- আমার বুঝার শক্তি নেই ? শুধু তোমারই আছে, তাই না ?
মুনীরা বলল, আমি কোন দিন তোমার সাথে র্তক করিনি ৷ আর করতেও চাই না ৷ বরং তিক্ততা বাড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্যে তোমাকে আমি অনুরোধ করছি ৷
- দেখ, ন্যাকামি ছাড়ো ! সতীত্ব নিয়ে বড়াই করোনা ৷ অত সতীপনা আমার সহ্য হয় না ৷
- আমি সতীপনা তোমাকে দেখাইনি ৷ আর সতীত্যের বাহাদুরিও আমি করি না ৷ আমি খুব ভাল করে দেখেছি , আমার শিক্ষা, আমার জ্ঞান তোমার সাথে মিলছে না ৷ তোমার রুচিটা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে ৷
- তাহলে এখানে আছ কেন ?
মুনীরা মুহুর্তকাল নীরব থেকে বলল, তাই ভাবছি কেন আছি, কেমন করে আছি ৷
- আমার ব্যাবহার যদি তোমার পছন্দ না হয় তাহলে তোমার যেখানে পছন্দ হয় চলে গেলেই পারো ?
মুনীরা চমকে উঠে মাহতাবের দিকে তাকাল ৷ তারপর একটা কথাও না বলে, কেটলির গরম পানিতে চা-পাতি ঢেলে দিল ৷
মাহতাব ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠল, অসহ্য ! বলেই চলে যাচ্ছিল ৷ মুনীরা বলল, যেওনা ৷ দাঁড়াও ৷ তোমার বন্ধুর নাশতা নিয়ে যাও ৷
- নাশতা তোমাকে নিয়ে যেতে হবে ৷
মুনিরা শান্ত- গলায় বলল, গেন্দাকে ডাকো, ওকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি ৷
- গেন্দা নয় তুমিই যাবে ৷
মুনীরা এক মুহুর্ত কী যেন ভাবল, তারপর বলল, আমাকেই যেতে হবে ?
- হ্যাঁ হ্যাঁ আমার হুকুম ৷
- ঠিক আছে ৷ তাই হবে যাও ৷
মাহতাব চলে গেলে মুনীরা তড়িঘড়ি করে কাপড় বদলাল ৷
মাথার চুলগুলি উল্টো করে রাবার দিয়ে আটকে নিল ৷ হাতা কাটা জামাটাও পরে নিল ৷ এই সব করতে গিয়ে একবার ভাই জানের চোখ দুটিও ওর মনের পর্দায় ভেসে উঠতে গিয়েছিল ৷ মুনীরা ওর সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সেই চোখ দুটিকে হটিয়ে দিল ৷
তারপর এক সময় আপন চোখের উদ্বেলিত অশ্রূরাশি মুছে ফেলে চা- নাশতার প্লেট নিয়ে রওশনের সামনে গিয়ে সে হাজির হল ৷
নাশতার ট্রেখানি টি-পয়ে নামিয়ে রেখে মুনীরা ডান হাত খানি কপাল বরাবর তুলে সম্ভাষণ জানিয়ে বলল, ভাল আছেন ?
রওশন মুনীরাকে দেখে অবাক হয়ে গেল ৷ এক মুহুর্ত তাকিয়ে নিয়ে বলল, জ্বি হ্যাঁ ৷ আপনি ভাল তো ?
- জ্বি হ্যাঁ ৷ মুনীরার হৃদয়ের জ্বালা ছাপিয়ে ঠোটের কোণে মৃদু হাসি দেখা দিল ।
৷
- বিয়ের ঘটক তো আমিই ছিলাম ভাবী ৷ রওশন বলল ৷
- জানি তো ৷ নিন্ একটু কিছু মুখে দিন ৷ বলে সেমায়ের পিরিচ রওশনের দিকে এগিয়ে দিল ৷ মাহতাবকে বলল, তুমিও নাও ৷
মাহতাব অবাক হয়ে গেছে ৷ ওর মুখে আর কোন কথা সরছে না ৷ ক'মুহুর্ত আগের সেই মুনীরা কে এখন আর চেনাই যাচ্ছে না ৷ একি ওর অভিনয়?
রওশন বলল, ভাবী আপনিও নিন!
মুনীরা হেসে বলল, আমি ভাই আপনাদের সাথে খাব না ৷ খাওয়ার ব্যাপারে অভ্যস্ত হতে আরও দেরি হবে ৷
রওশন জিজ্ঞেস করল, আপনি নাকি খুব পর্দা মানেন ?
- কে বলল ?
- মাহতাবই তো বলল ৷
আমাকে দেখে কি তাই মনে হচ্ছে ? আপনার বন্ধু খুব মিথ্যে কথা বলে ৷
মাহতাব হঠাৎ বলে উঠল , মিথ্যে কথা ?
- না, মিথ্যে হবে কেন ? আমাকে দেখে তোমাকে সবাই সত্যবাদীই বলবে, তাই না?
- রওশন হো হো করে হেসে উঠল ৷ বলল, ভাবী তো দারুন কথা জানেন দেখছি ৷
মনিরা প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, আপনি এখন থেকে তো ঢাকায় থাকছেন?
- আশা আছে ৷
- যদি থাকা হয় তাহলে আমিও একটা আশা করব আপনার কাছে ।
- কী সেটা ?
- আমি আপনার কাছে গান শিখতে চাই ৷ আমার গলা যদি উপযুক্ত হয় শেখাবেন?
- নিশ্চয় শেখাব ৷
- কিরে মাহতাব, ভাবী নাকী আউট ডেটেড ?
মাহতাব যেন কুল কিনারা পাচ্ছে না ৷ বলল, ছাড় ওর কথা, হঠাৎ কী মনে করে আজ ও অমন সোশ্যাল হয়ে উঠল ওই জানে ৷
মুনীরা কটাক্ষ করে বলল, তুমিও জানো ৷ কিন্তু তোমার বলার শক্তি নেই ৷
আপনারা খান আমি একটু বেয়াদবি করে আজ উঠি ৷ আবার দেখা হবে ৷ বলেই মুনীরা উঠে অন্য ঘরে চলে গেল ৷ ওর যাওয়ার দিকে রওশন মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইল ৷
সে দিন বিকাল বেলা গেন্দা বাজার থেকে ফিরে থলে নামিয়ে বলল, বাজারে হিং মাছ আজ নাইগ্যা আপামনি৷
- তাহলে কী এনেছিস ?
- দু আলি নলা আনছি ?
- পচা নয় তো?
না আপামনি ৷ এক্কেরে জেঁতা ৷ ফাল পাড়ছিল ৷ মুনীরা মাছের থলেটার মুখ খুলে দেখল বাস্তবিকই মাছগুলি তাজা ৷ গেন্দা সাহসা বলে উঠল, দাদা হেই আপার লগে রিকসা কইরা কই গেল, আপামনি?
গেন্দার কথা প্রথমে মুনীরা বুঝতেই পারেনি ৷ বলল, কী বললি রে গেন্দা ?
গেন্দা বলতে লাগল , আমাগোর বাসায় হেই একডা আপামনি আছিল না কদিন? হ্যারে লগে কইরা দাদা রিক্সায় বইয়া কাকরাইল থন পল্টনের দিকে গেল ? কই গেছে জানেন?
- তুই ঠিক দেখছিস ? মুনীরার মুখে অবাক প্রশ্ন ৷
- হায় আল্লাহ ! আমি হ্যেগোরে চিনি না ভাবতাছেন ?
মুনীরা সামলে নিয়ে বলল, আমাদের বাসায় যে মেয়েটি ছিল তাকে সাথে করে গেল, তাই না ?
- হ ৷
মুনীরা বলল, ওকে বোধ হয় হোস্টেলে রাখতে গেছে ৷ তুই মাছগুলো কুটে দে তো গেন্দু ৷
গেন্দা থলে নিয়ে চলে গেলে মুনীরা কয়েক মুহুর্ত চুপ চাপ বসে রইল ! তার মনে হল, নাচ গান দিয়ে জিনিয়া ওর স্বামীকে জয় করে নিয়েছে ৷ মাহতাব যেভাবে বখে গেছে, পবিত্রতার জন্যে তার কোন রুচি নেই ৷ সে চায় তার ষ্ত্রী নাচুক, গান করুক, তার রূপ-যৌবন অন্যের চোখকে ঝলসে দিক ৷ মুনীরা অবাক হয়ে ভাবে কী নোংরা ওর এই মানসিকতা ! এত বড় অন্যায়কে সে পাপাচার মনে করে না ? একটি যুবতী মেয়েকে পাশে বসিয়ে রিক্সায় করে ঘুরতে তার মনে কোন অন্যায় বোধের উদ্রেক হয় না? একজন মুসলিম সন্তান হয়ে তার এই অন্যায় কাজের জন্যে আল্লার কাছে জবাব দিহির ও ভয় জাগে না? কি অমানুষ ওটা ! ঐ রকম অমানুষের সাথে কেমন করে ঘর করবে মুনীরা ? যৌবনের উদ্দাম তরঙ্গে ভেসে চলা একজন মাতালকে উদ্ধার করার ক্ষমতা কোথায় মুনীরার ? একবার ওর মনে হল , না ঐ নরপশুর সাথে সম্পর্ক রেখে তার পক্ষে চলা কিছুতেই সম্ভব নয় ৷ তার সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে সে ভাইয়ের বাসাতেই চলে যাবে ৷ পরক্ষণেই মনে হল সেতো দুর্বল নারী ৷ বয়সও তার কম? এই ঘর সে ত্যাগ করলে আবার কোথাও যেতে হবে ৷ সেটা ও যে মুনীরার কাছে অসহ্য, অকল্পনীয় ভেবে ভবে সে একেবারে বিহবল হয়ে পড়েছিল ৷ তার মনে হতে লাগল, টিক আছে , মাহতাব যে ভাবে পেতে চায় সেই ভাবেই প্রথমত সে গড়ে উঠবে ৷ তারপর সুযোগ মত মাহতাবের মনের ঘোড়াকে বলগা লাগাতে চেষ্টা করবে ৷ তা ছাড়া তো মুনীরার আর কোন উপায় নেই৷
সেইদিন রাত্রে মুনীরা মাহতাবকে বলল, আমাকে গান শোখানোর কী করলে?
মাহতাবের মেজাজ ভাল ছিলনা ৷ বলল, হঠাৎ আবার নতুন বাতিক চাপল কেন ?
- তুমিই তো একদিন ঐ বাতিক চাপিয়েছো ৷ জানো আমি তোমার যা পছন্দ হয়, তাই শিখব ৷ রওশন ভাইকে বলে দিও ৷
- গরজ থাকলে তুমিই বোলো ৷
মুনীরা মাহতাবের গায়ে হাত দিয়ে বলল, অমন রাগছ কেন?
ওর হাতখানি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মাহতাব বলল, রাখো তোমার ভাল-ভালানি ৷ গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালা হচ্ছে এখন ৷
- যদি তাই হয় আমার অপরাধ তুমি মাফ করতে পারো না?
- তোমার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য ৷
মুনীরা শান্ত কন্ঠে বলল, তাই ?
মুনীরার অন্তরটা জ্বলে যাচ্ছিল ৷ হঠাৎ বলে উঠল, আমিও জানি আমার অপরাধ ক্ষমার যোগ্য নয় ৷ সেদিন যদি তোমার ওই প্রিয়তমাকে জায়গা না দিয়ে দুর করে তাড়িয়ে দিতাম তাহলে ভাল করতাম ৷ সেটাই ছিল আমার অপরাধ ৷
মাহতাব পাশ ফিরে শুয়ে বলল, কী বললে ?
মুনীরা দৃঢ় কন্ঠে বলল, জিনিয়াকে সাথে নিয়ে রিকসা করে কোথায় যাও শুনি ?
- মিথ্যে কথা ৷ ওসব কে বলল, তোমাকে ?
- তুমি যদি খুব সত্যবাদী হয়ে থাকো , তাহলে অস্বীকার করো।
- অস্বীকার করতে যাব কেন? আমার যেখানে খুশি সেখানে গিয়েছি ৷ আমি যখন বাসায়
না থাকি, তখন তুমি যে কোথায় কোথায় ফিল্ডিং মারো আমি তা তোমাকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েছি কখনো ?
মুনীরার মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল, বলল, তুমি একটা নরপশু বুঝলে ?
হঠাৎ মাহতাব ঠাস করে মুনীরার গালে একটা চড় কষে দিয়ে বলল, নরপশুর সাথে সতী-সাধ্বীর ঘর করতে লজ্জা করে না?
মাহতাবের হাতের চড় খেয়ে মুনীরার বুকের মধ্যে আগুন ধরে গেল ৷ সে অত বড় হয়েছে কিন্তু কারুর কাছে কোন দিন একটা ছোট আঘাত ও পায়নি ৷ মুনীরা নীরব হয়ে পড়ে রইল ওর দুচোখের অঝোর পানিতে মাথার বালিশ ভিজে যেতে লাগল ৷
তিন দিন কথা বন্ধ রাখার পর মাহতাবের যেন হঠাৎ করেই মনে হল, সে অনেকটা বড়াবাড়ি করে ফেলেছে ৷ মুনীরা তো নিজেই সেধে সেধে বলেছিল, মাহতাব যে রকম পছন্দ করে সেই রকমই সে হয়ে উঠবে ৷ দেখা যাক ৷ সে প্রথমে গানই শিখুক ৷
রওশন এসেছে ৷ মাহতাব ইচ্ছে করে মুনীরার কছে গিয়ে দাঁড়ল ৷ তারপর বলল, রওশন এসেছে ৷ সত্যি যদি তুমি গান শিখতে চাও, তাহলে আমি তোমাকে মাফ করতে পারি ৷
মুনিরা যেন বোবা হয়ে গেছে ৷ ওর মুখে কোন কথাই সরছে না ৷ হঠাৎ দুটি চোখে ওর দুটি পানির ধারা নামল ৷
মাহতাব শুধাল, ওকে কী বলব ?
মুনীরা আদ্র গলায় বলল, ওঁকে আগামী কাল থেকে আসতে বলো ৷
প্রথম দিন রওশন ও মাহতাব দু'জনই ছিল ৷ রওশন জানতে চাইল, ভাবী গানটান একটু আধটু জানেন তো ?
মুনীরা হেসে বলল জানিনা বটে, কিন্তু আমার সাহস হচ্ছে শিখতে বোধ হয় পারব ৷
- একটি গানও জানেন না? কোন দিনই কিছু একটা গান নি?
- ছোট বেলার কথা ৷ তখন ষ্কুলে এক-অধবার গেয়েছি বৈকি! সেতো প্রেমের গান নয় তো ভাই৷ এখন যে আমি প্রেমের গান শিখতে চাই ৷ বলে সে মিষ্টি করে হাসল ৷
- যাই হোক বলুন একটা ৷
মুনীরা লজ্জা জড়তা এক মুহুর্তে মুছে ফেলল ৷ সাহসাই সে গান গাইতে শুরু করে দিল, রোজ হাশরে আল্লাহ আমার করোনা বিচার আল্লাহ করোনা বিচার ...
গান শেষ হ'লে মুনীরা তাকিয়ে দেখল, রওশনের দু'চোখ ও ভারী হয়ে উঠেছে ৷ মাহতাব বলল, আমার তো মনে হয় খুব ভালই পারবে ৷ কি বলিস রওশন?
রওশন বলে উঠল, চমত্কার ! ইউনিক হবে ৷
===================================================
প্রতিদিন সাড়ে তিনটার দিকে রওশন মুনিরাকে গান শিখাতে আসে ৷ আর তার আধ ঘন্টার মধ্যে অফিস থেকে ফিরে আসে মাহতাব ৷ কোন কোন দিন আবার জিনিয়ার কাছে গেলে বেশ খানিকটা দেরী ও হয়ে যায় ৷ মুনীরা রওশনকে চা-নাশতা খাইয়ে তারপরে যেতে দেয় ! সাত দিনের মধ্যেই মুনীরা রওশনের কাছে অনেকটা সহজ হয়ে উঠল ৷ মুনীরা মনে হচ্ছে তিল তিল করে ওর গড়ে তোলা আদর্শের সুউচ্চ প্রাচীরটা ধ্বসে যাচ্ছে ৷ মনে হচ্ছে অর্ধেকটাই এখন ধ্বসে পড়েছে ৷ যে-রওশনের কাছে যেতে খুবই অন্যায় মনে হত, তাকেই এখন যেন চোখে ওর বেশ ভাল লাগছে ৷ রওশনের চোখ গুলো ভারী সুন্দর ৷ মনে হয় ঐ দুটো চোখে কখনো কোন ক্রোধ ঝরে পড়বে না ৷ অথচ মাহতাবের চোখ ? মনে হয় হিংস্র পশুর দু'টি জ্বলন্ত-চোখ ৷ রওশনের হাতের আঙ্গুল গুলি দীর্ঘ আর সরু ৷ দেখতে যেন চাঁপাকলির মতন ৷ মাহতাবের হাত খানি মনে হয় হিংস্র বাঘের থাবা ৷ বাঘের মত হিংস্র না হলে সে কি কখনো মুনীরার গায়ে হাত তুলতে পারে?
দু'জনের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে মুনিরা হত বিহবল হতে লাগল ৷ একবার তার মনে হল রওশন অবিবাহিত ৷ কেন সে বিয়ে করেনি ?
বিয়ের বয়স তো তার হয়েছে ৷ তা হলে রওশন কউকে কি ভালবাসে ?
ভালবাসলেতো কমপক্ষে মাহতাব জানত, মুনীরার কানেও পৌঁছত সে কথা ৷ না না কাউকে সে ভালবাসে না ৷
তাহলে সে কি ভালবাসতে জানেই না ? কী সুন্দর করে তাকায় রওশন ! এই চোখে কি পৃথিবীর কোন সৌন্দর্য এর একটু ও মুল্য নেই ? মনীরার চোখে মাহতাবের চাইতে রওশনকে এখন অনেক বেশি সুন্দর লাগছে ৷
বারে বারে ওর মনে হতে থাকে, রওশন তুমি সুন্দর ৷ তুমি নিজেই বিয়ের বর না হয়ে কেন ঘটক হয়েছিলে রওশন? কেন হয়েছিলে ?
কত কিছু ভাবছে মুনীরা, ওর চোখে সাহসা ভেসে উঠল, সেই বিয়ে ... খোখাদাদ খান রোডের সেই বাড়িতে, যেখানে তার শ্রদ্ধেয় ভাইজান থাকেন ৷ এখনও আছেন ৷ ওই তো ভাইজান দাঁড়িয়ে ৷ মুনীরার মনের পর্দায় বড় বড় দুটি চোখ হঠাৎ করে ভেসে উঠল ৷ দু'টি চোখের কোণে হঠাৎ করে দুই বিন্দু অগ্নিকণা মুনীরা দেখতে পাচ্ছে ৷ সেই অগ্নিকণা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে ৷ ... বেড়ে উঠেছে মুহুর্তে মুহুর্তে ৷ অগ্নিকনা দু'টি প্রচন্ড লেলিহান শিখায় রূপান্তরিত হচ্ছে ৷ সেই লেলিহান শিখায় তীব্র নীলাভ আগুনে রওশান হঠাৎ করেই যেন ছাই হয়ে গেল ৷ মাহতাব ছুটে পালাতে যাচ্ছিল ৷ তারও শরীরে আগুন লেগে দাউ দাউ করে জ্বলছে ৷
আগুনটি এবার ফিরেছে মুনীরার দিকে । ঐ তো ভাইজানের চোখের আগুন ৷
মুনীরা চিত্কার করে উঠল, ভাইজান!
অফিস থেকে বাসায় ফিরে হ্যাঙ্গারে জামা টাঙ্গাতে টাঙ্গাতে মাহতাব বলল,
রওশন আজ এসেছিল ?
মনিরার চেহারায় কেমন একটা অন্যমনষ্ক ভাব ফুটে উঠেছে ৷ কতকটা নির্লিপ্ত গলায় সে বলল, হ্যাঁ ৷
গান শিখতে বসেছিলে তো ? নাকি ওকে ফিরিয়ে দিয়েছ ?
মুনীরা তেমনী নির্লিপ্ত মুখেই বলল, বসেছিলাম ৷
মাহতাব অনেকখানি উত্সাহিত হয়ে উঠল, ভেরী গুড ৷ গানটা তুমি চট পট ভাল করে শিখে নাও , বুঝলে ? আমার মনে হচ্ছে তুমি একটু চেষ্টা করলেই তুখোড় হয়ে উঠবে ৷
মাহতাবের কথা শুনে মুনীরার মধ্যে কোন উত্সাহ দেখা গেল না ৷ সে শুকনো মুখে বলল, চল, খাবে চল ৷
মাহতাব পায়ের মোজা খুলতে খুলতে বলল, আমি খেয়ে এসেছি ৷ তুমি খেয়ে নাও ৷
কোথা থেকে খেয়ে এলে ? মুনীরা প্রশ্ন করল ৷
চপষ্টিকে আমার এক মক্কেল চাইনিজ খাইয়ে দিল ৷ সে তোমার কথাও বলছিল ৷ আমি বললাম, ও তো আর এ বেলা আসতে পারবে না ৷ রাত্রি প্রোগ্রামে ওকে আমি নিয়ে আসব খন ৷
মুনীরা চমকে উটে বলল, রাত্রির প্রোগ্রাম ! সে আবার কোথায় ?
মাহতাব হাসতে হাসতে বলল, আজ বাঙ্গালিকে আমি হাই কোর্ট দেখাব ৷
মুনীরা গাম্ভীর্য কাটিয়ে শুকনো হাসি ঠোঁটে রেখে বলল, হাইকোর্ট দেখাবে তো রাত্রি বেলা কেন ?
- দিনের বেলা কি আর সেই হাইকোর্টের সৌন্দর্য খোলে ? তখন সে এত নির্জীব পাষান পরীর হয়ে থাকে ৷ তখন কেবল কতকগুলো রসকষহীন জজ- মেজিষ্ট্রেট আর উকিল- ব্যারিস্টার, চোর-চ্ছ্যাচ্চড়, খুনি- হাইজ্যাকার নিয়ে ধুনো জ্বালিয়ে বসে থাকে ৷ সৌন্দর্য খোলে সেই রাতের বেলা ৷ তখন সে এক উদ্ভিন্ন যৌবনা অপরূপ সুন্দরী রূপে সেজে ওঠে ৷ তোমার মতই! পার্থক্য শুধু এতটুকু যে তার হৃদয় এ রংও আছে , রসও আছে ৷ তোমার মধ্যে যে জিনিসটির অভাব ৷ বলেই মাহতাব কুট দৃষ্টিতে মুনীরার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল ৷
মুনীরা মাহতাবের খোঁচাটি গায়ে মাখল না ৷ বলল, হাইকোর্ট রঙ্গ রস সে কি কথা ?
মাহতাব তেমনি রসিকতা করে বলল, তুমি যে রকম বাঙালী তোমার হাইকোর্ট ও তেমনী হবে তো৷
- তুমি যেমন করে বলছ , আমার সত্যি ভয় করছে ৷
মাহতাব সাহস দিয়ে বলল, আরে ভয় নেই, ভয় নেই ৷ তুমি তো আর একলা যাচ্ছি না তোমার সঙ্গে আরো একজন মহিলা যাবে ৷
- কে সে ?
- সে মহিলাকে তুমি চিনতে পারবে না ৷ তাকে আমরা হেলেন ভাবী বলে ডাকি! রেডিওতে গান গায় ৷ থাকে রাংকিন ষ্ট্রীটে ৷
- সে মহিলা তোমার সাথে যাবে ?
- আরে না, তার হাজবেণ্ডও যাবে ৷
মুনিরা শুনে এক মুহুর্ত চুপ করে রইল ৷
মাহতাব জিজ্ঞেস করল, কি, যাচ্ছো তো ?
মুনীরা ভাবলেশহীন ভাবে এক মুহুর্ত মাহাতবের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, যাব ৷
মাহতাব জবাব শুনে খুশি হযে উঠল ৷ বলল , তাহলে ঝট পট খাওয়া দাওয়া সেরে রেডি হয়ে নাও ৷ একটু বার করে ড্রেস করে নিও ৷ তোমার সেই কাঠমোল্লাকিটা আজ যেন ঘাড়ে ভর না করে ৷ হেলেন ভাবী ভীষন আপটুডেট মানুষ ৷ সেকেলেপনা তার দু’চোখের বিষ ৷ তার কাছে আমাকে আবার লজ্জা পেতে হয় না যেন ৷
মুনীরা নিষ্প্রাণ পুতুলের মতন নীরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাহতাবের কথাগুলো শুনে গেল ৷
মাহতাব তার ডাগর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, পারবে তো ?
মুনীরা অষ্ফুট স্বরে উচ্চারন করল, পারব ৷
ঠিক সময় মতই মুনীরা ঝলমলে পোশাক-আশাকে শরীর মুড়িয়ে মিটসুবিশি কারের পাশে এসে দাঁড়াল ৷ মাহতাব কারের; দরজা খুলে মুনীরাকে উঠিয়ে নিয়ে গাড়িতে স্ট্রার্ট দিল ৷ ওদের গাড়িটি প্রায় নিঃশব্দে দ্রুত এগিয়ে চলল ৷ রাস্তায় কিছুদূর এসে এবার গাড়িটি ডান দিকে মোড় নিয়ে অল্প দূর এগিয়ে একটা বড়ো সড়ো বাড়ির সামনে খোলা লনে এসে দাঁড়াল ৷ মুনীরা বাড়ির সাইন বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে দেখল, বড় বড় করে একটা হোটেলের নাম লেখা আছে ৷
জিজ্ঞেস করল, এটাই কি তোমার সেই হাইকোর্ট ?
মুনীরা রসিকতা করছে ভেবে মাহতাব উত্ফুল্ল হয়ে উঠে বলল, ও হো তোমাকে বলতে ভুলে গেছি, এটা উকিল ব্যারিস্টারের হাইকোর্ট নয়, এটা সেই বাঙালীকে দেখাবার হাইকোর্ট। জীবনের সুধারস আকন্ঠ পান করতে হলে যে তীর্থে মানুষকে যেতে হয়, এ সেই তীর্থ ৷
মুনীরা ভেতরে ভেতরে ভীত হয়ে উঠল ৷ বলল, তুমি তো জানো হোটেল ফোটেলে যাওয়া আমার পছন্দ হয় না ৷
- কিন্তু কেন পছন্দ হয় না শুনি ?
- ওরা কী সব খেতে দেয় হারাম-হালালের বাছ বিচার নেই ৷ শুনি নাকি মরা মুরগীও ফেলে না ৷ রান্না করে ডিশে সাজিয়ে দেয় ৷ ছিঃ...
মাহতাব বলল, তোমার যত্তো সব আজগুবি কথা ৷ আর দিলেই বা ৷ মুরগী তো আর কেউ তাজা খায় না ৷ জবাই করলেও তো মরে ৷
মুনীরা বাদানুবাদ না করে নিশ্চুপ হয়ে গেল ৷ সে মনে মনে ভাবল, এই বিদ্রোহী লোকটির সাথে তর্ক করে কোন লাভ নেই৷
মাহতাবের গাড়িটি এসে ধীরে ধীরে কোর্ট ইয়ারে ঢুকল ৷ অনেক লোক আসছে ৷ তারা হাত ধরা ধরি করে হোটেলের করিডোর ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।
মুনীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল এত লোক কেন গো?
মাহতাব জবাব দিল, লোক তো হবেই ৷ আজ যে হোটেলে ফাংশান
৷
কী ফাংশান ?
জংলী রাত৷
জংলী রাত! মুনীরা অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠল ৷ সে জানে ঐ জংলী রাতকে কেন্দ্র করে কিছু দিন যাবত্ সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে ৷ খবরের কাগজ খুললেই জিনিসটা চোখে পড়ে ৷ জানা গেছে এই অনুষ্ঠানে মেয়েরা ছেলেরা একসাথে নাকি নাচানাচি ঢলাঢলি করবে ৷ নিজের স্বামীকে অন্য মেয়ের কাছে ঠেলে দিয়ে অন্যের স্বামীকে সাথে নিয়ে নাচানাচিতে মেতে উঠবে ৷ সে হবে মাতালদের এক ধুন্ধুমার কান্ড কারখানা ।ক্ষোভে-দুঃখে-ভয়ে মুনীরা একেবারে এতটুকু হয়ে গেল ৷ হতাশ চোখে সে একবার মাহতাবের দিকে তাকাল ৷ তার সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, তার স্বামী, একী অদ্ভুত হাসি হাসছে ! ওর হাসিতে যেন বন্যপশুর হিংস্র মুখ-ব্যাদান দেখতে পাচ্ছে মুনীরা ৷
মাহতাব ডাকল, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো ৷
ভয়ে মুনীরার বুক থর থর করে কাঁপছে । ওর পায়ে যেন কোন শক্তি নেই ৷
বোকার মতন সে প্রশ্ন করল, কোথায় যাব ?
মাহতাব খেঁকিয়ে উঠল, এখন ন্যাকামী ছাড়ো তো ? শীগগীর আমার সাথে চলো ৷
চারদিকের ভাব-সাব দেখে মুনীরা মাহতাবের গা ঘেষে হাঁটতে লাগল ৷
হলে-ঢোকবার আগে লম্বা একটা করিডোর ৷ সেই করিডোর দিয়ে দলে দলে জোড়-মানিকরা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে ৷ একজন চ্যাপটা মুখো গোলগাল মানুষ মনিরার মুখের দেকে তাকিয়ে কী যেন দেখছে ৷ বোধ হয় লোকটি খুঁজছে কাউকে ৷ একবার মুনীরার মুখের কাছে মুখ এনে কী যেন সে বলতে চাইল ৷ লোকটা জবাব না পেয়ে টলতে টলতে অন্য দিকে চলে গেল ৷ ওর নিঃশ্বাস কেমন যেন একটা গন্ধ ৷ জিভ দিয়ে সে ঠোঁট চাটছে ৷ আর একটু হলেই ওর জিভটা মুনীরার গালেই লেগে যেত ৷ মাহতাবের সে দিকে কোন লক্ষ্য নেই ৷ ভয়ে মুনীরা মাহতাবের গায়ের সথে মিশে গেছে ! এসব অভাবিত কাণ্ড কারখানা সহ্য করতে না পেরে মুনীরা বিদ্রোহ প্রকাশ করে বলল, ওখানে আমি যাব না ৷ কিছুতেই যাব না ৷
মাহতাব ক্রুদ্ধ হয়ে প্রশ্ন করল, কেন যাবে না, কেন?
- এত সব মানুষের মধ্যে গেলে আমি মরে যাব ৷
মাহতাব দাঁত খিঁচিয়ে বলল, সেটা হলে তো আমি নিষ্কৃতি পেতাম ৷ বলেই মাহতাব মুনীরার একখানা হাত ধরে বলল, দোহাই তোমার , এই মুহুর্তে তুমি আমাকে এ রকম ডিসটার্ব করো না৷
মুনীরার কোন দিকেই খেয়াল নেই৷ জোর করে সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, আমাকে তুমি বাসায় নিয়ে চলো ৷ বলেই সে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়াল ৷
মাহতাবের সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে ৷ আর থাকতে না পেরে ঠাস করে মুনীরার গালে এক চড় কষে দিল ৷
মাহতাবকে চড় মারতে দেখে একজন আধবয়েসি লোক বলে উঠল, ও নো নো ৷ ডোন্ট ষ্ল্যাপ হার অন দা ফেস ৷ শী আপেয়ার্স টু বী ভেরী মাচর ৷ সরি ইউ ডোন্ট নো হাউ টু ম্যানেজ আউয়াইল্ড টাইগ্রেস ৷ বলেই লোকটি জঘন্য দৃষ্টিতে মুনীরার দিকে তাকিয়ে রইল ৷
মুনীরা চড় খেয়ে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মত মাহতাবের দিকে তাকাল ৷ এক মুহুর্তের নির্বাক দাঁড়িয়ে থেকে বলে উঠল, ঠিক আছে, তুমি থাকো, আমি একাই চলে যাচ্ছি ৷ বলেই সে আর সোজা হয়ে দাড়াতে পারল না ৷ ঝপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল !
অবস্থা বেগতিক দেখে মাহতাব আশা ছেড়ে দিল ৷ মুনীরার নেতিয়ে পরা দেহটি কোনমতে গাড়িতে উঠিয়ে সে বাসার দিকে ছুটে চলল ৷
পরদিন সকাল সকালই মাহতাবকে অফিস থেকে বাসায় ফিরতে হল ৷
রাত্রি বেলাতেই অবশ্য মুনীরার সংজ্ঞা ফিরেছে ৷ কিন্তু সকাল পর্যন্ত-ও তার মানসিক ভারসাম্য ঠিকমত ফিরে আসেনি ৷ কেমন যেন ভাবলেশহীন ভীতি-বিহবল চাহনি ৷ মুনীরা যে এত বেশী ঘাবড়ে যাবে, মাহতাব তা আন্দাজ করতেই পারেনি ৷ এখন সে কি অবস্থায় আছে দেখার জন্য তার মন ছটফট করছে ৷ তা ছাড়া আজ দুপুরে জিনিয়ারও আসার কথা ৷ সেও পর পর তিন দিন কথা দিয়ে কথা রাখেনি ৷ সে যদি কাল কথা রক্ষা করত, তাহলে মুনীরাকে নিয়ে এই ঘটনাটি কিছুতেই ঘটত না ৷ মাহতাবের সাথে জিনিয়া লাঞ্চ খাওয়ার কথা ৷ সেই মোতাবেক সব কিছু ঠিক ঠাক করাও হয়েছিল ৷ কিন্তু মাথা ব্যাথার অজুহাতে জিনিয়া যায়নি ৷ আগে ডাকলেই যেত ৷ এখন নাকি ওর ঘন ঘন মাথা ব্যাথা হচ্ছে ৷ সেদিন ওর সেই নীপা নামের বান্ধবীটি বলল, জিনিয়া নাকি একজন কবি কবি ছোকরার সাথ ঘোরে ৷ ঘুরুক দেখা যাবে ৷
মাহতাব বাসায় ফিরে দেখল, গেন্দা থালা বাসন ধুয়ে তুলছে ৷ শুধাল , বিবি সাহেব কই রে ?
- আপামনি, বাইরে গেছে ৷
-কখন ?
- এক ঘন্টা অইব ৷
- এরকম আগেও যেত, তাই না ?
- না , কুনু দিনও না ৷
মাহতাব ভাবতে লাগল , কোথায় সে যেতে পারে ? একবার মনে হল, ঠিক জিনিয়ার হোস্টেলে গিয়েছে ৷ জিনিকে সে পাবে না ৷ তখন সন্দেহ টা দানা বেধে উঠবে ৷ বাসায় ফিরে এসে যখন ভুলটা ভাঙ্গবে তখন যা একটা লজ্জা পাবে না ?
দারুন হিংসুক মেয়ে বটে !
জামা কাপড় খুলে ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করল মাহতাব ৷ এখনও ফিরছে না কেন? ত'হলে ভাগল নাকি কোথাও ? কোথায় সে যাবে ? কার সাথেই বা যাবে ?
হঠাৎ মনে হল রওশনের কথা ৷ মাহতাবের বুকের মধ্যে একবার ধড়াস করে উঠল ৷ ঠিক রওশনই ওকে নিয়ে ভেগেছে ৷ মুহুর্ত মাহতাবের চোখে আঁধার ঘনিয়ে এলো ৷ মুনীরার অনিন্দ সুন্দর মুখখানি ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল ৷ রওশন ওকে নিয়ে ভেগেছে ? শালা রওশন ! বিশ্বাস-ঘাতক ! মাহতাব দারুণ মর্ম যাতনায় ছটফট করছে ৷ ঠিক এমনি সময় হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠল ৷
গেন্দা দরজাটা খুলে দিল আর তখনই ঘরে ঢুকল রওশন ৷
রওশনকে দেখেই মাহাতহব বলে উঠল , মুনীরা বাসায় নেই ৷
- বাসায় নেই ? গেছে কোথায় ?
মাহতাব হতাশ গলায় বলল, তা তো বলে যায়নি ৷ এরকম একলা সে কোন দিনই বাসার বাইরে যায় না ৷
রওশন ব্যাকুল কন্ঠে প্রশ্ন করল , তাহলে ?
- এখন তো কিছুই আমি বুঝতে পারছিনা ৷ রওশন ! সব যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে ৷
রওশন সান্তনার সুরে বলল, তাহলে হয়ত কোন জরুরী কাজে বাইরে গেছে ৷ ফিরে আসবে ৷
- জরুরী কাজেও যে একা একা বাইরে যাবে তেমন মানুষ তো সে নয় ৷ ওর তো সে সাহসই নেই ৷
- আগে অবশ্য সে রকম ছিল, কিন্তু ইদানিং তোর কাছে ট্রেনিং পেয়ে ভাবী অনেকটা সাহসী হয়ে উঠেছে ৷ ঘাবড়াবার কিছু নেই ৷
<ড়>মাহতাব নির্বোধের মত বসে বসে নানা কথা অনুমান করতে লাগল ৷ ভাবতে ভাবতেই ওর সিগারেটের নেশা ধরল ৷ বালিশের নিচে সিগারেট খুজতে গিয়ে হঠাৎ সে এক টুকরো কাগজ পেয়ে গেল ৷ কাগজ টা পড়েই মাহতাব শিউরে উঠল ৷ তারপর রক্তহীন পাংশু মুখে সে রওশনের দিকে তাকিয়ে রইল ৷ ওর দুটি চোখ যেন পাথর হয়ে গেছে ৷
ওর ঐ রকম চোখ দেখে রওশন জিজ্ঞেস করল, কী হল ? কাগজে কী ?
মাহতাবের মুখে কোন কথা নেই ৷ নিঃশব্দে সে কাগজের টুকরোটি রওশনের দিকে এগিয়ে দিল ৷ ওর হাত থেকে কাগজের টুকরোটি নিজের হাতে নিয়ে রওশন পড়তে লাগল৷
মাহতাব,
আমাকে যে পথে নামাবার জন্যে তুমি প্রাণাপণ চেষ্টা করেছ , আমি ভেবে চিন্তে-দেখলাম সে পথে আমার জন্যে কোন আকর্ষণ নেই ৷ আজ থেকে দু'জনের পথ দুটি দিকে মোড় নিয়ে ঘুরে গেল ৷ আমি জানি, একদিন তোমার ভুল ভাঙবে, কিন্তু ততদিন হয়ত আমিই ভেঙে গুড়ো হয়ে যাবো। ভয়ে তোমাকে ছেড়েই আমি চলে গেলাম ৷ জানি , তুমি আমার উপর রাগ করবে, কিন্তু যার হাতে আমার জীবন-মরণ,যাঁর কাছে একদিন আমাকে সমস্ত কাজের জবাবদিহি করতে হবে, তাঁর রাগের কাছে তোমার রাগ অতি তুচ্ছ ৷ আমাকে আর তুমি বৃথা খুঁজতে যেও না ৷ খুঁজেও আর কখনো দেখা পাবে না ৷ ইতি-
মুনীরা৷
আকাশের সিঁড়ি বেয়ে পুর্ণিমার গোলগাল চাঁদ তখন ওপর দিকে উঠেছে ৷ দুর পাল্লার একখানি যাত্রিবাহী কোচ হু হু করে ছুটে চলেছে ৷
জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে চোখ রাখল মুনীরা ৷ আবছা অন্ধকারে ফাঁক দিয়ে চাঁদটাও যেন বেদম দৌড়াচ্ছে ৷ ধোঁয়াটে দিক চক্রবাল কুয়াশায় আছন্ন ৷ সব কিছুই এখন ছায়া ছায়া অস্পষ্ট লাগছে ৷
সত্যিই কি আকাশ আজ কুয়াশা মলিন ? নাকি মুনীরার দুচোখের লোনা পানিতে ঝাপসা হয়ে উঠেছে চরাচর ৷
মুনীরা চোখর পানি মুছল ৷ এই মুহুর্তে আকাশের দৃশ্যপট ওর অশ্রূ ভেজা চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ৷ খন্ড খন্ড মেঘের আড়ালে অস্তা-চলগামী চাঁদ বার বার লুকোচুরি খেলছে ৷ পথের ধারে জ্বলো মাঠ ৷ দিগন্তের কোন অজ্ঞাত গহবরে মাঠের সে-প্রান-হারিয়ে গিয়েছে ৷ অস্পষ্ট চন্দ্রলোক সীমাহীন পানির হাওড় ঝিকমিক করছে ৷ মাঝে মাঝে ঝোপ ঝোপ কি যেন চোখে পড়ছে ৷ একটু ভাল করে দেখল মুনীরা ৷ ঠিক মত ঠাওর করা যাচ্ছে না ৷ শাপলা ফুল নয়ত?
অস্ত-গামী চাঁদের দিকে চেয়ে থাকা বিরহ কাতর শাপলা ?
তীব্র গতিতে ছুটে-চলা নৈশকোচের একটি আসনে মুনীরা চুপ চাপ বসে আছে ৷ মাথার ওপরকার বাল্বটা বোধহয় নষ্ট হয়ে গেছে ৷ ওপাশের একটা ছোট বাল্ব থেকে একটু আলো আসছে ৷ ভালো করে কারুর চেহারা দেখা যায় না ৷
কাউকে দেখারও তার কোন খেয়াল নেই ৷ লক্ষ্যহীন ভাবে মুনীরা তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে ৷
এমনি ভাবেই বুক ভরা আশা নিয়ে একদিন নৈশকোচে স্বামীর পাশে বসে মুনীরা এসেছিল তার নতুন সংসারে ৷ প্রতিটি মুহুর্তে নতুন নতুন আশা আকাঙ্খায় আর নতুন নতুন কল্পনার রঙে সেদিন হৃদয়মন তার রাঙা হয়ে উঠেছিল ৷ সে তার নতুন সংসারটিকে পবিত্র আর স্নিগ্ধ সুষমায় কানায় কনায় পূর্ণ করে তুলতে চেয়েছিল ৷ চঞ্চল প্রজাপতির মতন মুনীরার মনটি ছিল সে দিন নৃত্যপর ৷ কিন্তু হায়, দুদিন যেতে না যেতেই সেই আনন্দের সব টুকু রূপান্তিরত হয়ে গেল দুঃসহ বেদনায় ৷ দুদিনের সেই বাসন্তী জীবনে যখন ফুল ফুটতে গেল, ঠিক তখনই আকাশ জুড়ে নেমে এলো দুঃখের ধারা ৷ মুনীরার আশার ফুলকলি ভেসে গেল সেই শ্রাবনের কূলভাঙা প্লাবনে ৷
গাড়ির জানলা দিয়ে মুনীরা দেখতে পাচ্ছে তীব্র গতিতে সব কিছু সরে যাচ্ছে পেছনে ৷ আর তার সাথে সাথে মুনীরার ফেলে-আসা সংসারের ব্যাবধানটিও হয়ে উঠেছেন দুস্তর ৷ এখান প্রতিটি মুহুর্তে সেই ব্যাবধান বাড়ছে ৷
একটি ফাটল যেন বড় হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে ৷ এত খোলা মেলা আকাশ, এমন অবারিত হু হু করা বাতাস, তবু কেন মুনীরার দম বন্ধ হয়ে আসছে ?
কেমন একটা বিতৃষ্ণার ভাব বুক ঠেলে তার গলার দিকে উঠতে চাইছে ৷
জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা , জগতের প্রতি বিতৃষ্ণা ৷ কেন তার জীবটা এমন হল?
মুনীরার মনে ঝড় বইছে ৷ উথাল পাথাল ঝড় ৷ হু হু করছে বুকের ভেতরটায় ৷ বার বার তার মনে উঁকি ঝুকি মারছে একটি ভাবনা ৷ এ সিদ্ধান্ত ভুল সিদ্ধান্ত নয়ত ? ভাইজান সবটা জেনে যদি তার এই সিদ্ধন্তকে অন্যায় ভেবে বসেন? তখন কী হবে? মুনীরার আরো কি সহ্য করা উচিৎ ছিল? আর কি সহ্য করতে সে পারত ? অধঃপতনের সবগুলো পথই তো তার সামনে উম্মূক্ত হয়ে যাচ্ছিল৷ মুনীরা কি সম্ভ্রম নিয়ে টিকে থাকতে পারত?
যে-স্বামী তার নিজের ষ্ত্রীকে স্বেচ্ছায় অন্যের দিকে ঠেলে অন্যের ষ্ত্রীকে কাছে টেনে নিতে চায়, মুনীরার কাছে শুনবার পরও কি ভাইজান অমন স্বামীর ঘর করতে তাকে পীড়াপীড়ি করতে পারবেন? মুনীরার তিল তিল করে গড়ে তোলা আদর্শের এই স্বর্ণ-সৌধকে মাহতাব নিমেষে ভেঙে চুরমার করতে চেয়েছিল ৷ মুনীরার মনের সৌরভে মাহতাব তৃপ্ত হয়নি, পুঁতিগন্ধময় আস্তাকুঁড়ের দিকেই তার ছিল লোলুপ দৃষ্টি, এমনি একজন মানুষকে কী দিয়ে ভোলাবে? কোন আকর্ষণে তাকে বশে আনবে?
মাহতাব মুনীরার যৌবন-পুষ্ট নারী-দেহটিকে প্রদর্শনীর বস্তু করতে চেয়েছিল ৷ তাকে নর্তকী বানানোর জন্যে সে উঠে পড়ে লেগেছিল ৷ এ যে ভাইজানের শিক্ষা-দেওয়া আদর্শের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ৷ এই বিদ্রোহ এর কথা জানাবার পরও কি ভাইজান মুনীরাকে তিরষ্কার করতে পারবেন?
বাইরের দৃশ্যপট থেকে মুনীরা এবার ভেতরে চোখ ফেরাল ৷ পিছনে যাত্রীরা প্রায় সবাই ঘুমে ঢুলছে ৷ ঘোলাটে আলোতে বাসের ভেতরটা অস্পষ্ট লাগছে ৷ বাস চলতে শুরু করতে না করতেই পাশের মেয়েটি ঢুলতে লেগেছে ৷ পেছনের মেয়েটি বোধ হয় অনেক্ষন জেগেছিল ৷ এবার সেও ঘুমিয়ে গেছে ৷ বাসে উঠে পেছনের মেয়েটি একবার মুনীরার সাথে কথা বলতে চেয়েছিল ৷ মুনীরার কি মুড ছিল জবাব দেবার? না, জবাব সে দেয়নি ৷ মেয়েটিও শেষ পর্যন্ত চুপ করে গেছে ৷ মনের ঈষাণ কোণে ভাবনার মেঘগুলি এখন কুণ্ডলি পাকিয়ে আকাশে উঠেছে ৷ মুনীরার জীবনে এ এক কঠোর অগ্নি-পরীক্ষা ৷ সুখ-সম্ভোগ কামনা-বাসনার কাছে পরাজয় অথবা জীবনের পরম সত্যের মর্যাদা দিতে গিয়ে তিল তিল করে যন্ত্রণাকে স্বীকার করে নেওয়া ৷ এই যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত হতে হতে দুনিয়ার বদলে সে আখেরাতের দিকে চোখ ফিরিয়েছে ৷ সে জানে, স্বামী পরম গুরু সন্দেহ নেই, কিন্তু যে-স্বামী খোদার হুকুমের বিরুদ্ধাচারন করতে বলে, তার আনুগত্যের মধ্যে কল্যাণ নেই ৷ তার অন্যায় আদেশ মেনে নেওয়া যায় না ৷ সেই নির্দেশ মান্য করা নয়, অমান্য করার মধ্যেই কল্যাণ ৷
দ্রূতগামী গাড়িটির ড্রাইভারের দিকে চোখ পড়ল মুনীরার ৷ সবাই যখন ঘুমে ঢুলছে, ড্রাইভার তখন সতর্ক দৃষ্টি মেলে স্টিয়ারিং হাতে বসে আছে গাড়ির সামনের সিটে! বাসের সমস্ত- যাত্রীর দায়িত্ব তার হাতে ৷
রাত্রির এই বাসটিকে হাকিয়ে নিতে গিয়ে তার চোখের ঘুম গিয়েছে টুটে ৷ একটু উদাসীনতার কারণে সর্বনাশ হতে পারে, মাহতাবও তেমনি ছিল একটি পরিবারের চালক ৷ তার অসতর্কতাও তেমনি তার পারিবারের সর্বনাশের কারণ হয়ে ধ্বংস ডেকে এনেছে ৷ মুনীরার কী করবার ছিল?
বাসের যাত্রীরা সবাই এখন গাঢ় ঘুমে অচেতন ৷ সিটের ওপর আধশোয়া হয়ে দু একজনের এখন নাকো ডাকছে ঘরঘর করে। পেছনের মেয়েটিও এতক্ষণ জেগেছিল মনে হয় ৷ এবার সেও ঘুমিয়ে পড়েছে ৷ মেয়েটি কিছুটা আলাপী স্বভাবের ৷ গাড়িতে উঠে কোথায় যাবেন ইত্যাদি ধরনের একটা-দুটো প্রশ্ন করে সে বোধ হয় আলাপ জমাতে চেয়েছিল ৷ কিন্তু মুনীরার অসম্ভব সংক্ষিপ্ত জবাবের কারণে সে নীরব হয়ে গেছে ৷ মেয়েটি হয়ত মনে করেছে মুনীরা অমিশুক ৷ সত্যি কী তাই ? মুনীরা তো সত্যিকারের অমিশুক নয়! বরং কেউ তার সাথে আলাপ করতে চাইলে স্বতঃস্ফুর্ত হয়েই তার সাথে সে আলাপ জমায় ৷ আজ যে সে তা পারছে না ৷ আজ তার আনন্দ-চঞ্চল হৃদয় ঐ দিগন্ত-জোরা পাথরের মতন নিস্তরঙ্গ হয়ে গেছে ৷ হয়ত বা কোন পাগলা হাওয়ায় ওর সেই হৃদয় আকষ্মাৎ তরঙ্গে তরঙ্গে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে ৷ সে ভয়েই তো মুনীরা নিজেকে সংকুচিত করে নিয়েছে ৷
মেয়েটি সিটে হেলান দিয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে ৷ ওর মুখের ওপর একটা পরম প্রশান্তি-যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে ৷ মুনীরা যদি ঘুমোতে পারত, তাহলে তার মূখও কি অমন প্রশান্ত-দেখাত? অমন নিরুদ্বিগ্ন, ভাবনাহীন?
একটি অপ্রত্যাশিত আচমকা ধাক্কা খেয়ে হকচকিয়ে উঠল মুনীরা ৷ ড্রাইভার বাসটিকে হঠাৎ হার্ড ব্রেক কষে থামিয়ে দিয়েছে ৷ আচমকা ধাক্কায় বাসের যাত্রীদের অনেকেই তাল সামলাতে না পেরে ঠোকঠুকি খেয়ে জেগে উঠেছে ! মুনীরা দেখতে পেল, একটা জীর্ণ-শীর্ণ কুকুর ঘেঁউ করে আওয়াজ দিয়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ল ৷ চাঁদের আবছা আলোয় কুকুরটাকে দৌড়ে পালাতে দেখা গেল ৷ যাক, বেঁচে গেছে কুকুরটা! ড্রাইভার হ্যাঁচকা ব্রেক কষে না দিলে পিষে যেত ওর দেহটা ৷ যাত্রীদের কাছে এই অপ্রত্যাশিত ধাক্কাটা কিন্তু পছন্দ হয়নি ৷ কেউ কেউ ঘুম জড়িত গলায় ড্রাইভারকে গালও দিল যাচ্ছে তাই ভাষায় ৷ ড্রাইভারটা ফিরে না চেয়ে ততক্ষণে গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছে টপ গিয়ারে ৷
আবার ছুটে চলেছে নৈশকোচ ৷ আবার যাত্রীদের ঢুলুনি শরু হল ৷ পিছনের মেয়েটির বোধ হয় ঘুম ভেঙ্গে গেছে ৷ মুনীরাকে জেগে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছিল, আপা?
মুনীরা এবার জবাব না দিয়ে পারল না ৷ বলল, গাড়ির সামনে একটা কুকুর পড়েছিল ৷ কুকুরটাকে বাঁচাতে গিয়ে ড্রাইভার ব্রেক করেছে ৷
- বেঁচেছে কুকুরটা?
- দেখলাম তো পালিয়ে যেতে ৷
- যাক, তবু বাঁচা গেল৷ মেয়েটি আড় মোড় ভেঙে হাই তুলে বলল, কিন্তু এই রকম করেই একসিডেন্ট হয় ৷ কুকুর বাঁচাতে গিয়ে শেষতক মানুষই মেরে বসে ৷ গাড়ির কন্ট্রোল হারিয়ে বেকায়দায় পড়ে, তাই না?
মুনীরা কথার কোন জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল ৷
জবাব না পেয়ে মেয়েটির উৎসাহটাও মিইয়ে পড়ল। সেও চুপ করে গেল।
নৈশকোচটি পাকশী ঘাটে যখন শেষ ফেরীতে উঠল, রাত তখন ভোর হয়ে এসেছে ৷ মাঝরাতের পর এক সময় এক পশলা বৃষ্টি নেমেছিল জোরে ৷ আর তার পরেই উঠেছিল ঠাণ্ডা বাতাস ৷ সেই বাতাস এখন আরো তীব্র হয়ে উঠেছে ৷ ফেরীতে গাড়ি ওঠবার পরেই মুনীরা বুঝতে পারল ওই বাতাস এখন নদীর বুকে মাতলামো শুরু করেছে ৷ সারাটা নদী বড় বড় ঢেউএ তোলপাড় করছে ৷ গোলগাল চাঁদটি অনেক্ষণ হল মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছিল, আড়ালটুকু সরে যেতেই কেমন ফ্যাঁকাশে মুখে সে তাকাতে লাগল ৷ ম্লান নিষ্প্রভ আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে ৷ মনে হচ্ছে সারা জগৎ আলো-আঁধারিতে ডুবে আছে ৷
মুনীরার ডান হাতের মধ্যমাটা চুলকাচ্ছে হঠাৎ ৷ ছোট একটা ফুষ্কুড়ি উঠেছে ৷ মুক্তো বসানো আঙটির নীচে ফুষ্কুড়িতে চুলকানি ছাড়া কোন ব্যথা নেই! চুলকাতে গিয়ে মুনীরার ষ্মরণ হল, হাতের এই আংটিটিও সে ভুল করে নিয়ে এসেছে। মাহতাবের সংসার থেকে কোন কিছুই তার আনবার ইচ্ছা ছিল না। আনেওনি। কিন্তু আসবার সময় এই মুক্তো বসানো আংটির কথা তার মনেই হয়নি ৷ খেয়াল হলে এটাও সে খুলে রেখে আসত ৷
মুক্তোর আংটির ওপর আঙ্গুলের স্পর্শ লাগল মুনীরার ৷ মনে হচ্ছে এই আংটিটি যেন বড় মুখরা ৷ ওর নির্বাক মুখে যেন হঠাৎ কথার ফুলঝুরি ফুটে উঠেছে ৷
মনে পড়ে মাহতাব তার জীবনের প্রথম বেতন পেয়ে এই মুক্তো বসানো সোনার আংটিটি ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ মুনীরার জন্যে কিনে এনেছিল জুয়েলারী থেকে ৷ একান্তে-কাছে পেয়ে মুনীরার চাঁপা-কলির মতন নরম আঙ্গুলে মাহতাব নিজ হাতে এটি পরিয়ে দিয়েছিল ৷ স্বামীর আদরে সেদিন আশ্চর্য্য শিহরণ বয়ে গিয়েছিল মুনীরার সারা দেহে ৷ সেই মধুরতম মুহুর্তটির কথা এখন ওর মনের মধ্যে কাঁটার মতন বিঁধেছে ৷ একটা অস্বস্তিকর অনুভুতি কেবল তালগোল পাকিয়ে ওর বুক থেকে গলার দিকে ঠেলে ঠেলে উঠছে ৷ থেকে থেকে পাক দিচ্ছে পেটের ভেতরে ৷ আংটিটি নদীর পানিতে ফেলে দিলে কি এই অস্বস্তি দূর হবে? মুনীরা টেনে টেনে আংটিটি খুলতে চেষ্টা করল! মাহতাব সেদিন যে আংটি ওর আঙ্গুলে সহজে পরিয়ে দিয়েছিল, আজ তা শক্ত হয়ে আঙ্গুলের গাঁটে বসে গিয়েছে৷ সহজে আর খোলা যাচ্ছে না ৷ কোন পিচ্ছিল জিনিস না লাগিয়ে আর খোলাও যাবেনা ৷
রাত্রি জাগরণের ধকলেই বোধ হয়, বিবমিষাটি বাড়তে শুরু করেছে ৷ মুনীরা খুব চেষ্টা করেও বমি রোধ করতে পারল না ৷ জানালার বাইরে মুখ রেখে হড় হড় করে অনেকখানি বমি করে ফেলল ৷ পেছনের সিটে বসা মেয়েটির চোখে পড়ে গেল ব্যাপারটা ৷ হক-চকিয়ে উঠে সে মুনীরারকে জিজ্ঞেস করল,কী ব্যাপার বমি হচ্ছে নাকি?
মুনীরার গলা বুঁজে আসছে ৷ কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ৷ কষ্ট করেই জবাব দিল হঠাৎ পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠছে ৷ বমি হচ্ছে দেখছি ৷
- মাথায় পানি দেবেন?
-পানি এখন কোথায় পাওয়া যাবে?
- দাড়ান, আমার ফ্লাস্কে পানি আছে, বের করে দিচ্ছি ৷ বলেই মেয়েটি মস্ত বড় ব্যাগের ইন্টারলক খুলে সুদৃশ্য একটা থার্মোস বার করল ৷ তারপর বলল, ঠাণ্ডা পানি আছে কুল্লি করুন, আর চোখমুখে ঝাপটা দিন ৷ আরাম হবে ৷
মেয়েটির কথা মত পানির ঝাপটা দিতেই মুনীরার অস্বস্তি কমে আসতে লাগল ৷ মেয়েটি এবার মুনীরা কে সুস্থ হতে দেখে জিজ্ঞেস করল, সঙ্গে আর কে আছেন?
- আর কেউ নেই ৷ মুনীরা আবার সংক্ষিপ্ত জবাব দিল ৷
- কেউ নেই? আপনি তাহলে একাই যাচ্ছেন?
- হ্যাঁ ৷
- একসকিউজ মী আপনি তো ম্যারিড?
- জি হ্যাঁ ৷
- আপনার হাজবেণ্ড? মেয়েটি যেন নাছোড় বান্ধা হয়ে উঠেছে ৷
মুনীরা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারল না ৷ কিন্তু জবাব ও তার সহজ হচ্ছে না! বলল, খুব ব্যস্ত মানুষ কিনা ৷
- ও তাই বুঝি আসতে পারেন নি? আপনি তাহলে একা একাই যাতায়াত করেন?
- না, এবারই প্রথম ৷ এর আগে কখনো একলা আসিনি ৷
- বেশ ৷ বলেই মেয়েটি পেছন থেকে কেমন সন্দেহ জনক দৃষ্টিতে বার বার মুনীরার দিকে তাকাতে লাগল ৷ খানিকক্ষন পর বলল, জার্নি তো আমাদের শেষ হয়ে যাচ্ছে ৷ ঠিক শেষ মুহুর্তে আপনার সাথে আলাপ হল ৷ মন খুলে কথা বলার সুযোগ পেলাম না ৷ আপনাকে অন্যমনষ্ক দেখে কথা বলতে পারিনি ৷
মুনীরা ম্লান হেসে বলল, অন্যমনষ্ক ছিলাম? হতে পারে ৷ দেখলেন তো কেমন বমি হয়ে গেল? শরীরটা আগে থেকেই খারাপ ছিল৷
- তাই-ই হবে! বলেই মেয়েটি পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখল, ওর পাশে একজন যুবক এসে দাঁড়িয়েছে ৷ সুর্দশন চেহারা, মাথায় কোঁকড়ানো চুল ৷ পাশে দাঁড়িয়ে সে বলল, হাসি, ঝটপট রেডি হয়ে নাও ৷ সামনে স্টপেজেই আমাদের নামতে হবে ৷
- আমি রেডি হয়েই আছি ৷ আমার হিসাব আছে ৷ ঠিক সময়ই নামা যাবে ৷
তুমি তাড়াতাড়ি ওভালটিনের ফ্লাষ্কটা এনে দিতে পারো?
- এখন আবার ওভালটিন কী করবে?
- দরকার আছে, প্লিজ যাও না ৷
- কেন, তোমার ব্যাগে ছিল না?
না না, এখানে পানিরটা আছে ৷ ওটা আমি তোমার সুটকেসে ভরে দিয়েছি ৷ শীগগীর যাও, প্লিজ...
- কই, চাবি দাও ৷ যুবকটি হাত পেতে দাড়াল ৷
হাসি ওকে চাবি দিতে দিতে বলল, ফ্লাস্কের কাছেই বিস্কিটের প্যাকেট আছে ওটাও এনো, বুঝেছ?
চাবি হাতে নিয়ে যুবকটি বলল, এত ভোরে তোমার খিদে পেয়ে গেল?
ব্যাপার কি? বলেই সে হুকুম তামিল করতে চলে গেল ৷
পুবের আকাশটা দ্রুত ফর্সা হয়ে আসছে ৷ এক টুকরো কালচে মেঘের নীচে শুভ্র আলোর রেখা চকচকে হয়ে উঠেছে ৷ মুনীরা সেই দিকে তাকিয়ে বসেছিল ৷
হাসি বলল, বমি করে আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে ৷ একটু কিছু মুখে না দিলে আপনার ক্লান্তি যাবে না ৷ তাই ভেবেই আমি ওকে ওভালটিন আনতে পাঠালাম!
মুনীরা আপত্তি বরে বলল, না না, আমার এখন কিছু খাওয়ার ইচ্ছে নেই ৷
- না থাকুক৷ একটু চেষ্টা করলে খাওয়া অসম্ভব হবে, এমন নয় ৷ তাছাড়া খাওয়া তো এমন বেশী কিছু নয়, সামান্য একটু ওভালটিন ৷
কথার মাঝখানে যুবকটি এসে ফ্লাষ্কটি দিতে দিতে বলল, ধরো পরে এসে ওটা আমি নিয়ে যাব৷
হাসি বাধা দিয়ে বলে উঠল , না না, তোমার টুকু এখনই নিয়ে যাও ৷
আপন সিটে বসে বসে চুমুক দাও গে ৷
ঝিমুনি-লাগা যাত্রীদের অনেকেই এখন আড়মোড়া ভেঙ্গে জাগছে দেখে হাসি সর্তক হয়ে গেছে ৷ যুবকটি ফ্লাস্কের মুখের বাটিতে গরম ওভালটিনে ভরে আপন সিটের দিকে চলে গেল ৷ মুনীরার বেশ সহজ লাগছে ৷ জিজ্ঞেস করল, উনি আপনার কে?
হাসি হেসে উঠে বলল, বুঝতে পারছেন না? একটু বেশী ছোকরা ছোকরা দেখতে মনে হচ্ছে তো ? তাই গোলমাল হচ্ছে ৷ উনিই তো আমার উনি ৷
মুনীরা মৃদু হেসে হাসির মুখের দিকে তাকাল ৷
হাসিও এবার ভাল করে মুনীরার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল ৷ তারপর প্রশ্ন করল, আচ্ছা আপনি আজিজুর রহমান প্রাইমারী ষ্কুল চেনেন?
মুনীরা চমকে উঠে অবাক কন্ঠে বলল, চিনি মানে ? আমি তো সেই ষ্কুলেই পড়তাম ছোট বেলায় ৷
- তাই?
- হ্যাঁ।
- হাসিনা নামের একটি মেয়ের কথা মনে পড়ে ?
মুনীরা একটু ভাবতেই মনে পড়ে গেল ৷ বলল, ওদের বাড়ি যশোরে ৷ বাবা জজ কোর্টের হাকিম ছিলেন ৷ কি নামটা যেন ছিল ... কিন্তু কেন বলুন তো?
- হাসি এবার গম্ভীর হয়ে উঠে বলল, আর কেন, শুনেই বা কী হবে? এখনও যখন চিনতেই পারলি না, তখন আর চেনাতে গিয়ে কাজ নেই৷
- হাসি? তুই? বলে হঠাৎ মুনীরা একেবারে ধড়মড়িয়ে উঠল৷
হঠাৎ ওর এই আচরন দেখে মুনীরার পাশের মেয়েটিও ঘুম ভাঙ্গা-অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ৷
হাসি বলল, বোস বোস ৷ বাসের মধ্যে আর সিন ক্রিয়েট করিসনি ৷ যাত্রীরা নাটক মনে করবে ৷
মুনীরা ধপ করে বসে পড়ল ৷
হাসি বলতে লাগল, তোকে আমি প্রথম প্রথম একদম চিনতেই পারিনি ৷ একে তো গাড়ির বাতির দুরবস্থা, তার ওপর তুই সারাক্ষন বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকছিস ৷ চিনব কি করে ? তা ছাড়া কত বছর হবে বল দিকিনি?
বারো তেরো বছর তো হবেই ৷ এক যুগ এরও বেশী এতদিন পর একটা মানুষকে কি চট করে চেনা যায়? আর সেই সময়টা আমাদের ছিল বাড়ন্তকাল ৷ তখন ছিলি ক্ষুদে এক রত্তি মেয়ে ৷ এখন একেবারে রূপসী মহিলা যাকে বলে ৷ কিন্তু তবু চিনলাম কেমন করে বল তো?
- কী করে জানব?
- তোর ঐ হাসি দেখে ৷ হাসিটা কিন্তু তেমনি আছে রে মনি, একটুও বদলায় নি ৷
হাসীর স্বামী এসে জানিয়ে দিয়ে বলল, তোমার সেই বাকী পথটুকু এবার শেষ হয়ে এসেছে ৷ এবার না নামলে আর উপায় নেই৷
- জানি৷
- তাহলে লটবহর নিয়ে তৈরী হয়ে যাও ৷ দুমিনিট সময় দিচ্ছি।
হাসি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এবার গোটা কুলীগিরিটা তোমাকেই করতে হবে ।
আমার ওদিকে হাত দেবার জো নেই৷
- মানে ?
মানে অন্য একটি লটবহর আমি পেয়ে গেছি৷ সেটা নিয়েই নামব ৷
হাসিনার স্বামী অবাক হয়ে গেছে ৷ অবাক কন্ঠে বলে উঠল, তোমার কথার মানেটা বুঝা যাচ্ছে না ৷
- বোঝা যাবে যাবে, মানেটা পরে তোমাকে উইথ দ্যা রিফোরেন্স টু দ্যা কনটেকস্ট বুঝিয়ে দেব ৷ এখন যা বলছি করো ৷ জিনিস পত্র গুলো তুমি সামলাও ৷ মনি ওঠ এক্ষুণি আমাদের নামতে হবে ৷
মুনীরাও এবার অবাক হয়ে গেছে ৷
হাসিনা বলে উঠল, হা করে দেখছিস কী? গাড়ি কি আর আমাদের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবে?
মুনীরা আপত্তি করে বলল, না ভাই , আজ থাক, একদিন আসব তোর বাসায়৷
- বারো বছর পরে সেই একদিনটাই তো আজ রে ৷ ওঠ্ ওঠ্ গাড়ি ছেড়ে দেবে!
জি, কে, প্রজেক্টের ফীডার ক্যানেল থেকে মাইলটেক দুরে সারি সারি স্টাফ কোয়ার্টার ৷ উত্তর দক্ষিণ রাস্তা ৷ রাস্তার এক পাশে বেশ বড়ো সড়ো ভি, আই, পি, রেস্ট-হাউস ৷ কিছু উত্তর দিকে এগিয়ে গেলে একটি ঝাঁকরা কৃষ্ণচুড়ার গাছ ৷ তার তলে একতলা একটা হলুদ রঙের বিল্ডিং ৷ হাসিনাদের বাসা ৷ হাসিনার স্বামী আফজাল হোসেন ওয়াপদার ইনজিনিয়ার ৷ বছর দুই থেকে ওরা এখানেই থাকে ৷ হাসিনা মুনীরাকে নিয়ে এই বাসাতেই উঠল ৷
আফজাল হাসিনাকে বলল, উনি তোমার ক্লাস ফ্রেন্ড, আত্মার আত্মীয় ৷
কিন্তু আমি ওঁকে কী বলে সম্বোধন করব? ভাবী বলে?
হাসিনা কপট রাগ দেখিয়ে বলে উঠল, ভাবী কেন বলবে? ফাজলামো হচ্ছে,না? ওর হাজবেণ্ডকে তুমি চেনো ? দেখেছ কখনো ?
- জীবনেও না।
- তবে? যাকে চেনো না, তার বৌকে ভাবী বলা সাজে তোমার?
- তাহলে বলবটা কী, বলে দিবে তো?
- আমার বান্ধবী ৷ আমার থ্রুতেই তোমার সাথে পরিচয় ৷ আর তাই যদি হয়, তবে মনি হবে তোমার আপা ৷ আপা বলবে, বুঝেছ?
- বেশ তাই সই৷
- আর শোনো ,মনি কিন্তু খুব সভ্য মানুষ ৷ ওকে দেখেই তুমি বুঝেছ নিশ্চয়?
তোমার মত সে অসভ্য নয় ৷
মুনীরা এবার বিচলিত হয়ে উঠল ৷ চাপা রাগ প্রকাশ করে বলল, আঃ হাসি, কি বাজে কথা বলছিস?
- না না, বাজে নয় রে , মনি ৷ একশো ভাগ ঠিক বলছি ৷
- একশো ভাগ যদি ঠিক হবে, তাহলে স্বয়ং উনি কিভাবে সভ্য হলেন সেটা একবার জিজ্ঞেস করুন তো আপা ৷ আফজাল মাঝখানে প্রশ্ন করে বসল ৷
হাসিনা গম্ভীর মুখে জবাব দিল, শোন সায়েব, মানুষ তার ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহন করে, আর বাপ-মা তাকে কাফের মুশরিক বানায় ৷ তেমনি ষ্ত্রীও ভাল মানুষটি হয়েই স্বামীর ঘরে আসে, আর স্বামী তাকে সভ্য-অসভ্য বানায়, বুঝেছ?
- বুঝেছি, তবে তোমার উক্তির শেষাংশটুকু মেনে নেয়া কষ্টকর ৷
- কেন, কষ্টকর হবে কেন? আচ্ছা বলতো, তুমিই কি আমাকে অসভ্য বানাও নি?
আফজাল মাথা চুল কিয়ে বলল, সে সময় তুমি চট করে রাজি না হলে আমার দাদার সাধ্য কি যে... ..
হাসিনা কৃত্রিম রাগে চোখ পাকিয়ে বলল, এই, আবার ফাজলামো হচ্ছে?
ভালো হবে না তা বলে দিচ্ছি। একটা বলব আর ঠেলে ঠেলে অন্য দিকে নিয়ে যাবে ৷ বলতো হলপ করে, আমি তখন কি এইভাবে চলাফেরা করতে রাজি হয়েছিলাম? ঠিক ঠিক বলতো?
- ও, এই কথা? কিন্তু তখন তো একটা মুডে ছিলাম কিনা ৷ এখন অবশ্যি মনের পরিবর্তন হয়ে গেছে ৷ আফজাল বলল, এখন তুমি যদি ইচ্ছে করো তাহলে?
- তাহলে আর বাধা দেব না, এই তো ? কিন্তু সাহসা এই বোধোদয়ের হেতুটা জানতে পারি কি?
- লজ্জাটা যে নারীর ভুষন তা মনে হওয়াতেই এই বোধোদয় ৷
- হঠাৎ যে?
- হঠাৎই তো আমাদের আপাকে দেখলাম ৷
- তাঁকে ঠাট্টা করছ?
- মোটেও না ৷ হলপ করে যদি বলতে বলো, তাও পারি ৷ ঠাট্টা তামাসার কোন প্রশ্নই আসে না ৷ এ একেবারে নির্ভেজাল সত্য কথা ৷
হাসিনা কটাক্ষ করে বলল, যদি তাই হয়, তবে শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে বলতে হবে ৷
আফজাল কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, এখন রাখো তো তোমার ঐ সব প্যাচাল ৷ ক্লান্ত মেহমান কে একটু বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিবে কি, তার বদলে এখন তাঁকে বসিয়ে রেখে আমার সাথে লেগে পড়েছো ৷
মুনীরা হেসে বলল, না না, আবার বিশ্রামের কি দরকার? বেশ তো আছি ভাই, আমার ভালই লাগছে ৷
আফজাল বলল, ভাল লাগা পরে হবে আপা ৷ এখন হাত মুখ ধুয়ে কাপড় চোপড় পাল্টে একটু ঝর ঝরে হয়ে নিন ।
আমি বাইরে থেকে আসি, কেউ আছে কিনা দেখি ৷ ঘর-সংসার একেবারে মরুভুমি হয়ে আছে ৷ কাউকে বাজারে পাঠিয়ে দিই ৷ বলেই সে বাইরে চলে গেল ৷
সকালটা ঘুমিয়ে দুই বান্ধবী সারাটা দুপুর গল্প গুজবে কাটাল ৷ দীর্ঘ এক যুগ পরে আবার দুজনের এমনি ভাবে মিলন হবে, কেউই কোনদিন ভাবতে পারেনি ৷ ছোট বেলায় হাসিনা ছিল দারুণ চঞ্চল ৷ প্রায় দিনই ছুটির পর সে মুনীরাদের বাসায় চলে যেত ৷ তখনও খসরুর জন্ম হয়নি ৷ আসমা ভাবী একা একা থাকতেন ৷ হাসিনাদের কাছে পেলে তিনি খুবই খুশি হয়ে উঠতেন ৷ না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়তেন না ৷ আসমা ভাবী হাসীনাকে আপন ননদের মতই দেখতেন ৷
হঠাৎ একদিন হাসিনার আব্বা ট্রান্সফার হয়ে গেলেন কুমিল্লায় ৷ তারপরই ধীরে ধীরে ওরা হারিয়ে গেল পরস্পরের কাছ থেকে ৷ এখানে আসবার পরও হাসিনার মনে হয়েছে মুনিরাদের বাসায় সে একবার বেড়াতে যাবে ৷ কিন্তু আগের সেই আগ্রহ তখন কেমন যেন মিটিয়ে গিয়েছিল ৷ যাই যাই করে ও আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি ৷ ওরা দুজনে এতক্ষন সেই একযুগ সময়ের ওপর সেতুবন্ধন রচনায় ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিল ৷
আফজাল বাজার পাঠিয়ে চলে গেছে শহরে ৷ যাবার সময় হাসিনাকে বলেও যেতে পারেনি ৷ আফজালের অফিসে টেলিফোন করে হাসিনা তার যাওয়ার খবরটা জানতে পেরেছে ৷ মুনিরাকে সাথে নিয়ে সন্ধ্যের আগে আগে লেকের ধার দিয়ে তার একটুখানি বেড়াবার ইচ্ছে ৷ হাসিনা তাই তাড়াতাড়ি আফজালের আগমনের অপেক্ষায় ছিল ৷ কিন্তু খবর শুনে ওর মন খারাপ হয়ে গেল ৷ আজ কৃষ্ণপক্ষের শুরু ৷ পৌনে একঘন্টা দেরিতে চাঁদ উঠবে ৷
শেষ শ্রাবনের এই দিনটি ভারি চমত্কার ঝক ঝক করছে ৷ এক চিলতে মেঘ ও নেই কোথাও ৷ রাত্রিটাও ভ্রমনের জন্যে চমত্কার ৷
ক্যানেলের পার বরাবর হেরিংবন্ড রাস্তা ৷ ইটের ফাঁকে ফাঁকে নিরুপদ্রবে গজিয়ে উঠেছে সবুজ দুর্বা ঘাস ৷ সুযোগ হলেই ক্যালেন-পাড়ের পথ ধরে সন্ধার আবছা আঁধারে আফজালের সাথে সাথে হাসিনাও হাওয়া খেতে বেরোয়৷ হাঁটতে হাঁটতে বেশ দুর তারা চলে যায় ৷ পুব দিকের খোলা মাঠের তাজা বাতাস ফীডার ক্যানেলের পানির বুক ছুয়ে শীতল হয়ে বয়ে আসে ৷
হাসিনার ভাল লাগে ৷ সেই ভাল লাগার অংশীদার করতে চেয়েছিল সে মুনীরাকে ৷ কিন্তু আফজাল যদি সকাল সকাল না ফিরে, তাহলে কী হবে?
ভাবতে ভাবতে দরজার কড়া নড়ে উঠল ৷ কড়া নাড়ার বিশেষ ধরনটা আন্দাজ করে হাসিনা বুঝতে পাড়ল আফজাল এসেছে ৷ বিছানা ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বলল, দেরী করলে যে?
- তা একটু হয়ে গেল বটে ৷ শহরে চলে গিয়েছিলাম ৷
জানি, কিন্তু হঠাৎ কী এমন দরকার পড়ল যে শহরে ছুটতে হল?
হাতে ওটা কী?
- কী দেখ ৷ বলেই একটা কাগজের মোড়ক হাসিনার দিকে এগিয়ে দিল ৷
হাসিনা মোড়কটি হাতে টিপে টিপে দেখে বলল, কী আছে এতে? শাড়ীটাড়ি নাকি?
- উঁহু ৷
- তাহলে?
এক মুহুর্ত চুপ করে থেকে আফজাল বলল, আরে ভয় পেয়ো না ৷ সাপ বিচ্ছু নয়, কামড় দেবে না ৷
স্ট্যাপলার পিন নখ দিয়ে তুলে মোড়কটা খুলে দেখতেই হাসিনার মুখখানি খুশীতে উজ্জল হয়ে উঠল৷ বলল, শপথের সাথে সাথেই প্রমট একশান ৷ শপথটা যে মুখের নয়, মনের, তাই বোধকরি আমার বান্ধবীর কাছে প্রমান করে দিলে?
আফজাল বলল, তুমি যাই মনে করতে চাও, করতে পার ৷ আমার মনে হচ্ছে জিনিসটি এখন থেকে তোমার দরকার হবে ৷
- ঠিকই ধরেছ, আজই এই মুহুর্তেই দরকার হবে ৷ মুনীরাকে সাথে নিয়ে এখন একটু ক্যানেলের ধারে হাওয়া খেতে বেরোব ৷ ও শালীন পোশাকে যাবে আর আমি দিগম্বর সেজে যাব, সেটা খুবই খারাপ লাগত, তুমি দারুন সেভ করেছ সত্যি!
- তাহলে এবার থেকে আমাকে সভ্য বলবে নিশ্চয় ?
- একশো বার ৷ এই দোখো সভ্য .... সভ্য... সভ্য....তিনবার বললাম ৷ হল তো? আচ্ছা ওগো সভ্য, আমাদের বেড়ানোর সেই প্লানটা এবার একজিকিউট করো তাহলে৷
আফজাল অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, এ আবার কেমন ধারা সভ্য বানালে আমাকে? মাইনাসে মাইনাসে মাল্টিপ্লাই করে যেমন প্লাস হয়ে যায়, তেমনি সভ্যে-সভ্যের ঠোকাঠুকিতে অসভ্য বানাতে চাচ্ছ না তো?
হাসিনা আদুরে গলায় বলল, ওহরে, তুমি কত বড় সভ্য মানুষ, তোমাকে অসভ্য বানাবে কার ঘারে তিনটে মাথা?
পথে বেরিয়ে হাসিনা বলল, লেকের ধারে ধারে পায়ে হেঁটে আমরা একেবারে পাওয়ার হাউসে চলে যাব ৷
- সেই ভাল ৷ আপাকে পাওয়ার হাউসটা দেখিয়ে আনি ৷ এতদঞ্চলে দেখবার জিনিস তো ঐ একটাই ৷ আফজাল হাসিনাকে সমর্থন করে বলল৷
হাসিনা মুনীরাকে জিজ্ঞেস করল, কিরে বাঙ্গালী, হাইকোর্ট দেখতে যাবি তো?
মুনীরা সমর্থন দিয়ে বলল, মন্দ হয় না৷ চারদিকটা বেশ ঝক ঝকে তক তকে খোলা মেলা...
তোমার যদি পছন্দ হয়, তোর বর কে বলিস, এখানে এখন সস্তা জমি পাওয়া যাচ্ছে ৷ একটা প্লট কিনে ধীরে সুস্হে বাড়ি বানিয়ে রাখুন ৷ মাঝে মধ্যে রিক্রিয়েশনে আসবি ৷ আমরা যতদিন আছি খুব ফাইন হবে ৷ বলবি তো?
মুনীরার মুখখানি হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল ৷ আমতা আমতা করে বলল, দেখা যাক ৷
সন্ধ্যের খানিক পরে পুব আকাশে চাঁদ উঠল ৷ পথে লোকজনের ভীড় নেই ৷ কেবল দু'একজন ভ্রমণ বিলাসী সন্ধ্যা-ভ্রমণে বেরিয়েছে ৷ কারুর সাথে ছোট শিশু, কারুর হাতে বেতের লাঠি! তারাও এখন সবাই ঘরমুখো ৷
সাধারন মানুষের চলাচলের জন্যে পাকা সড়কটি ধীরে ধীরে নির্জন হয়ে উঠেছে ৷ সড়কের উত্তরে মস্ত একটা দীঘি ৷ পদ্মফুল আর শাপলায় ভরা ৷
ঝোপ থেকে ডাহুক আর কোড়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে৷ আফজাল হাটছে আগে আগে ৷ মুনীরা আর হাসিনা হাত ধরা ধরি করে পেছনে পেছনে ৷ হাঁটতে হাঁটতে এক সময় হাসিনা বলল, পরের বার যখন তোর বরকে নিয়ে ভাই-এর বাসায় আসবি, এখানে নামিস ৷ সপ্তাহ খানেক কাটিয়ে যাস ৷ সুন্দর পিকনিক স্পট আছে ৷ পাখি শিকারের জায়গা আছে ৷ তোর বরের খুব ভাল লাগবে দেখিস ৷
মুনীরা আর নিজেকে সম্বরন করতে পারল না ৷ বলে উঠল, হাসি, তোকে একটা কথা বলব, ভাই ৷
- কী কথা রে? মুনীরার কথা বলার ধরন দেখে হাসিনা চমকে উঠল৷
- তুই আমার ছোট বেলার বন্ধু ৷ তোকেই কথাটি বলে রাখি ৷ কাউকে তুই বলিস না ৷
হাসিনা শুনে অবাক হয়ে গেছে ৷ কিন্তু নিজের মনোভাব গোপন করে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, কাউকে বলব না ৷ কী কথা বল আমাকে ৷
মুনীরা আশ্বাস পেয়ে বলল, তুই বারবার যার কথা বলছিস, আমি তার কাছ থেকে চলে এসেছি ভাই ৷
- কার কাছ থেকে? তোর বরের কাছ থেকে? হাসিনা ব্যাকুল কন্ঠে প্রশ্ন করল ৷ বলিস কী তুই?
মুনীরা হাসিনার কথার জবাব দিতে না পেরে চুপ করে রইল ৷
- কী হয়েছিল তোদের মধ্যে যে এমন স্টার্ন ডিসিশন নিতে হল?
- সে তো ঢের কথা ৷ তোকে সবই বলব, শুনিস ৷ আমি ভেবে দেখলাম তোর সাথেই পরামর্শ করা উচিৎ ৷ এমন আর কেউ আমার নেই যে তার সাথে আমি পরামর্শ করি ৷ তবে তুই, ভাই বিষয়টা গোপন রাখিস ৷ বলেই সে একে একে মাহতাবের সাথে তার সম্র্পক এর অবনতির কাহিনীটি আদ্যপান্ত শুনিয়ে দিল ৷ দিয়ে বলল, শেষে আমাকে নিয়ে সে কি করেছিল, জানিস? আমাকে টেনে নিয়ে সে এক হোটেলে হাজির করেছিল ৷ আমি যদি শক্ত না হতাম, সে দিন আমার মান ইজ্জত ধুলায় গড়াগড়ি যেত ৷
ওর ঘর করতে গেলে আমাকে বাজারের মেয়ে-মানুষ হয়ে যেতে হত ৷ আমার অসহ্য হয়ে গিয়েছিল রে, হাসি ৷
সহ্যের সীমার একেবারে বাইরে চলে গিয়েছিল ৷ বলেই মুনীরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ৷
ব্যাপারটা শুনে হাসিনা একেবারে হতবাক হয়ে গেল ৷ হস্যোজ্জল ঠোঁট দুটি তার আঁউরে-পড়া গোলাপ পাপড়ির মতন ম্লান হয়ে উঠল ৷ চাপা রাগ প্রকাশ করে সে বলল, মানুষ তো নয় ৷ মানুষের বেশে নরপশু দেখছি ৷ বেশ করেছিস ঠিক করেছিস তুই ৷ একজন মেয়ের তার চেয়ে মরনই ভাল ৷ কাঁদিস নে , চুপ কর ৷
আল্লার ওপর ভরসা কর ৷ আল্লাই বিচার করবেন ৷
আফজাল হাঁটতে হাঁটতে খানিক দুর এগিয়ে গিয়েছিল৷ পেছন ফিরে দেখল, ওরা দুজন দাঁড়িয়ে আছে ৷ সেখান থেকেই সে হেঁকে উঠল, কী হল তোমাদের? এমন কচ্ছপ গতিতে পা চালালে এই তিনশো গজ পথ পাড়ি দিতেই যে রাত্রি ভোর হয়ে যাবে ৷
হাসিনা হাত ইশারায় আফজালকে ডেকে বলল, এই ফিরে এসো ৷ আজকে আমাদের আর ওখানে যাওয়া হবে না ৷ মুনীর শরীরটা ভাল করছে না ৷
কলিং বেলের আওয়াজ শুনে মাহতাব উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল ৷ রওশন আজ সকাল সকাল চলে এসেছে ৷ গতকাল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ওরা মুনীরার কোন সন্ধান করতে পারেনি ৷ শহরটা গতকাল একেবারে মিছিলের শহর হয়ে উঠেছিল ৷ পথে পথে মিছিলের ডামাডোলে গাড়ি-ঘোড়া প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল ৷ দুপুরের পর থেকে আর কেউ গাড়ি চালাবার চেষ্টাও করেনি ৷ মুনীরা তাহলে দুপুরের কিছু আগেই চলে গেছে ৷
মুনীরার চিঠি পাওয়ার পর রওশন ভালভাবেই বুঝতে পেরেছে যে, ব্যাপারটি গুরুতর! তাই ভেবে সাথে সাথেই মাহতাবকে মুনীরার খোজে বেরুনোর জন্যে সে চাপও দিয়েছিল ৷ হয়ত মাহতাব ভীষণ রেগে মেগে আগুন হয়ে ছিল ৷ রওশনের কথায় গুরুত্ব দেয়নি ৷ অথবা এমনও হতে পারে, মুনীরা যে সত্যি সত্যি চলে যাবে তা সে বিশ্বাসই করতে পারেনি ৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর যখন মুনীরা ফিরে এলোই না, তখনই মাহতাবের টনক নড়ল৷ তারপর দু'জনে তন্ন তন্ন করে কত খুঁজল৷ কিন্তু কোথাও মুনীরার হদিস পাওয়া গেল না ৷
বাসায় ফিরে সে-রাত্রে নিদারুণ ভয়ে মাহাতাব একেবারে অস্থির হয়ে পড়েছিল ৷ মর্মান্তিক সেই ভীতিটা মাহতাবকে যেন গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে ৷ বার বার তার মনে একটি প্রশ্নই শুধু জেগেছে মুনীরা আত্নহত্যা করেনি তো? সেই রাতের সেই অভিজ্ঞতার পর মুনীরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ কেমন যেন ভাবলেশহীন ৷ ভীতি যাকে বলে ঠিক তা নয়, ভীতির পরে যা ঘটে অথবা রাগের পরে যা ঘটে অথবা রাগের পরে যে স্তব্ধতা আসে যেন ঠিক তাই ৷ মুনীরার মুখের হাসি ফুরিয়ে গিয়েছিল ৷ মাহতাবের তখনই একবার মনে হয়েছিল, মুনীরাকে হোটেলে নিয়ে যাওয়া তার উচিত হয়নি ৷
কিন্তু উপায় কি? বন্ধুদের বৌ’রা যাবে অথচ মুনীরা যাবে না, তা কি কখনো হয়? তাই সে তাকে জোর করেই সেখানে নিয়ে গিয়েছিল ৷ পরিবেশটি দেখেই মুনীরা সেই যে বোবা হয়ে গেল, আর স্বাভাবিক হতে পারেনি ৷ কিন্তু তার জন্যে মুনীরা যে এতবড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে, তাও তো মাহতাব ভাবতে পারেনি৷ মুনীরা সত্যি সত্যি আত্নহত্যা করল নাকি? যদি তাই করে থাকে ? ভাবতে গিয়ে মাহতাবের সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে উঠেছিল৷ মাহতাব রওশনেকে সেদিন অনুরোধ করে বলেছিল, আজ রাত্তিরে তুই আমার কাছে থাক, রওশন ৷
অথচ রওশনের থাকার মোটেই কোন উপায় ছিল না ৷ সকালের দিকে মেজবুবুর মৃদু হার্ট এটাক হয়েছিল ৷ ডাক্তার তাঁকে হাসপাতালে নেবার পরামর্শ দিয়েছিলেন ৷ কিন্তু অবস্থাটা ভালোর দিকে যাওয়াতে রুগীকে বাড়িতেই রাখতে বলে গেছেন ৷ খুব সতর্কতার সথে দেখাশোনার জন্যে রওশনকে নিদের্শ দিয়ে গেছেন ৷ মেজবুকে একেবারেই নড়াচড়া করতে বারণ করেছেন ৷ তাছাড়া কেমন থাকেন তাও ঠিকঠিক মত তাঁকে জানাতেও বলে গিয়েছেন ৷ সেই খবরটা দিতেই রওশন ডক্তার সাহেবের চেম্বারে গিয়েছিল ৷ ফিরতি পথে সে ভেবেছিল মেজবুর অসুখের খবর মুনীরাকেও জানিয়ে যাবে ৷ কিন্তু এখানে এসে যা সে দেখল, তাতে তার বিষ্ময়ের অবধি রইল না ৷ তখন সে কী করবে? মুনীরার খোঁজ না নিলেও চলে না, আবার খোঁজ করতে গেলে মেজবুর দেখা শোনা করাও মুশকিল হয়ে পড়ে ৷ দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরে শেষ র্পন্ত মুনীরাকে খুঁজতেই নামতে হয়েছিল রওশনকে ৷ তবে এখানে রাত্র কাটানো সম্ভব হয়নি ৷ যাবার সময় রওশন খুব ভোরেই চলে আসবে বলে গিয়েছিল ৷ দুজনে পরামর্শ করে যা হয় কিছু করবে ৷
সারা রাত্রি মাহতাবের যে এক বিন্দু ঘুম হয়নি, তা ওর চোখ দেখলেই বোঝা যায়৷ রওশন সোফায় বসলে মাহতাব জিজ্ঞেস করল, এখন মেজবুর শরীর কেমন রে?
রওশন হেলান দিয়ে বসে বলল, একটু ভাল ৷ রাত্তিরে বাসায় ফিরে দেখি বুকে আবার ঝিম ঝিম করে অল্প অল্প ব্যাথা হচ্ছে ৷ সামান্য একটু বেড়েও গিয়েছিল৷ পরে আবার বেশ কমে গেছে ৷ রাত্তিরে আর কোন ডিস্টার্বেন্স হয়নি ৷ ঘুমও হয়েছে মোটামুটি ৷
- অসুখটা কি?
- ডাক্তার নাকি বলেছে, এঞ্জাইনা পেক্টোরিস- এক ধরনের হার্টেরই ব্যামো ৷ বুক থেকে ব্যাথা উঠে বাম বাহুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ৷ খুব কষ্ট হয় তখন মেজবুর, এমনিতেই কাহিল মানুষ একটু কিছু হলেই ভেঙ্গে পড়েন ৷ সকালে যখন আমি এখানে আসি, আমাকে ডেকে বলল, মাহতাবের বৌকে একবার আসতে বলিস তো রওশন! আমি আদেশ শুনে একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় যাকে বলে তাই হয়ে গেলাম ৷ কী জবাব দেব?
- কেন, মেজবুকে বলিস নি সব কথা?
-ওরে বাপরে! সব্বোনাশ হয়ে যাবে না তাহলে? এমনিতেই হার্টের রুগী, তার ওপর তোর বৌকে মেজবু যা ভালবাসেন, খবর দিলেই হয়েছিল আর কি!
মাহতাবের মুখের চেহারা মুহুর্তে বদলে গেল ৷ বলল, মেজবু তো ওকে দু’তিন দিনের বেশি দিখেন নি?
- কিন্তু তাতেই সে মেজবুর অন্তর একেবারে জয় করে ফেলেছিল ৷ একটা পরের মেয়ে, পরের বৌকে নিয়ে মেজবুকে অত আগ্রহ দেখাতে আমি জীবনেও কোনদিন দেখিনি ৷ সত্যি, আমি আশ্চর্য্য হয়ে গেছি ৷ পরকে আপন করে নেবার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার ৷ অথচ মানুষটি শেষ পর্যন্ত এটা যে কী করে বসল, ভেবে কোনো কুল কিনারা পাচ্ছি না ৷
রওশনের কথায় মাহতাব ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছে ৷ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ওর কাজ ও ঠিকই করেছে মেজবু ওকে ঠিক মতন চিনতে পারেন নি ৷ চকচকে দেখেছেন, ভেবেছেন একেবারে খাঁটি সোনা৷
- কিন্তু আমার আবার ধারণা টিক তোর বিপরীত ৷ মেজবুর চোখের দৃষ্টিকে আমি খুবই গুরত্ব দিই ৷ খাঁটি আর গিল্টি-করা -সোনার পার্থক্য সে চোখে ধরা পড়বে না, এ আমার বিশ্বাসই হয় না ৷ মেজবুর কথা ছেড়েই দে ৷
লিলি-মিলিরা? ওরা তো আর বায়াসট নয়৷ আমি দেখেছি মামী বলতে ওরা অজ্ঞান ৷ আমার মনে হয়, এ খবর যদি ওরা শোনে, কেঁদে কেটে হয়ত একটা কাণ্ড করেই বসবে ৷
রওশনের কথাগুলি এখন যেন ছুরির ডগার মতন মাহতাবের বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে ৷ মুনীরার চরিত্রের এই দিকটা মাহতাবের কোনদিনই অজানা নয় ৷ সে আল্ট্রা মডার্ণ হতে চায়নি তা ঠিক, তবে এও ঠিক যে, যার সংস্পর্সে সে এসেছে, তারই প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে একটুও তার দেরী হয়নি৷ মাহতাবও কি তাকে অপছন্দ করত নাকি? তার রূপে-গুনে মুগ্ধ হয়েই তো সে তাকে বিয়ে করতে উদ্যত হয়েছিল৷ বিয়ের পর স্বামী হিসেবেও মাহাতাব তার কাছে অপরিসীম প্রেম-প্রীতি ও শ্রদ্ধা পেয়েছে৷ অনাদর যাকে বলে মাহতাব কোনদিনই তার কাছে থেকে তা পায়নি৷ তবে এটা ঠিক, বিশেষ শেষ ক্ষেত্রে মুনীরা অনমনীয় ছিল, একেবারে আপোষহীন৷ সেইখানে মুনীরাকে মাহতাব যখন বাঁকাতে গিয়েছে তখনই সে টানটান হয়ে উঠতে চেয়েছে ৷ মাহাতাব জোর করে বাঁকাতে চেয়েছে ৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুনীরা ভেঙ্গেই গেছে৷ এইটিই তার ড্রব্যাক৷
মাহতাব রওশনকে প্রশ্ন করল, কি খাবি, চা না ওভালটিন?
রওশন চিন্তামগ্ন ছিল৷ নির্লিপ্ত ভাবে বলল, না, কিছুই খাবো না৷
মাহতাব রওশনের কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে গেন্দাকে ডাকতে লাগল৷ গেন্দা সাধারণত একবার ডাক শুনলেই, 'আইত্যাছি মিয়াবাই' বলে দৌড়ে আসে ৷ আজ আর চট করে তার সাড়া পাওয়া গেল না, বেশ খানিক পরে পিছেনের দরজা ঠেলে গেন্দা ওদের সামনে এসে দাঁড়াল৷ চোখ মুখ ওর ফোলা ফোলা৷ দেখে অনুমান হয় সারাটা সকাল ধরেই ছোঁড়া বসে বসে কেঁদেছে৷
মাহতাব জিজ্ঞেস করল, কিরে, তোর চেহরা ক্যান্ অমন হয়েছে? অসুখ-বিসুখ করেছে নাকি?
গেন্দা মাথা নাড়ল ৷ না, অসুখ করেনি৷ মাহতাব আবার জিজ্ঞেস করল, তাহলে কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন?
- আপামনি কই গেছে? বলেই সে ফোঁপাতে লাগল৷
- তার জন্য তোর ভাবনা কী? তুই কাঁদছিস কেন? মাহতাব খেঁকিয়ে উঠল৷
- আমার বালা লাগত্যাছে না৷ বলেই এই অবুঝ বালকটি অনিরুদ্ব কান্নার বেগ চাপতে গিয়ে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল৷
রওশনের চোখেও সংক্রমন শুরু হতে গিয়েছিল, সামলে নিয়ে বলল, আপামনির জন্যে তুই কাঁদছিস, তোকে খুব ভালবাসত না রে?
- হ ৷ ওর কান্না আর থামতে চায় না৷
মাহতাব বলল, তুই কাঁদছিস ক্যান ? তোর আপামনি বাইরে গিয়েছে, ফিরে আসবে দেখিস ৷ তুই আমাদের চা খাওয়াতে পারিস, গেন্দু?
- গেন্দা একটু চাংগা হয়ে উঠল৷ চোখ মুছতে মুছতে বলল, পারুম ৷
গেন্দা চলে গেলে রওশন বলল, দেখ , তোর বৌ এই ছোকরার তো আপন কেউ নয়৷ কিন্তু অবাক ব্যাপার! ওকে স্নেহ- মায়া দিয়ে কেমন শক্ত বাঁধনে সে বেধে গেছে, ভাবতেও আশ্চর্য লাগে৷
মাহতাব একটু দ্বিমত করে বলল, ছোঁড়া আগে যেখানে থাকত সে বাসার বৌটা শুনেছি ওকে খুব মারধোর করত ৷ এখানে এসে সেই পিটানি ওর পিঠে পড়েনি কিনা!
জবাবটি রওশনের মনঃপুত হল না৷ কিন্তু প্রতিবাদও সে করল না৷ চুপ করে গেল৷
কয়েক মুহুর্ত নীরব থাকার পর রওশন বলল, তুই ওর ভাই এর বাড়ি লোক পাঠিয়ে দে ৷ দেরি করা মোটেই উচিত হবে না৷
- কাকে পাঠাব?
- তাইতো ভাবছি৷ আমিই যেতাম৷ কিন্তু মেজবুকে ফেলে মোটেই আমার নড়বার জো নেই ।
- দূর হয়ে যাক ৷ মাহতাব আবার খেঁকিয়ে উঠল ৷ যে-জাহান্নামেই সে যেতে চায়, যাক না ৷ খুঁজতে যাওয়ার দরকার নেই ৷ সে তো খুঁজতে আমাকে বারণ করেই দিয়েছে ৷ একটা মেয়ে মানুষের জন্যে আমি আত্মসম্মান বির্সজন দিতে পারব না৷ ইমপসিবল৷
- কী বলছিস তুই মাহতাব ? মানুষ রাগের মাথায় অনেক কিছুই বলে, সেটাকে কি ব্যাংক করে বসে থাকলে চলে ? তোর নীতিজ্ঞন সত্যি আমার মাথায় ঢোকে না৷ কোন অঘটনও তো ঘটে যেতে পারে ৷ সেটা কি তোর জন্যেও শোভন হবে ভেবেছিস ? রওশন ঝাঁঝাঁল গলায় কথাগুলি বলে মাহতাবের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ৷
মাহতাব বোকার হাসি হেসে বলল, আমার কী হবে? কিছু হবে না, ও তো ডকুমেন্টই রেখে গেছে ৷ যে কোন প্রবলেমে এই চিঠিই আমাকে হেলপ করবে ৷
রওশন ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল৷ মনে মনে বলল, ইডিয়ট! মুখে বলল, খুব যত্ন করে ওটা রেখে দিস, বুঝলি? স্বর্ণকারকে দিয়ে একটা তাবিজ বানিয়েও রাখতে পারিস৷ ওটা তোর অনেক কাজে লাগবে ৷ আচ্ছা, তুই কী রকম মানুষ রে? একটা বেড়াল যদি কেউ পোষে, তার জন্যও তো মনের মধ্যে একটু দয়ামায়া হয়৷ তোর যে তাও নেই৷ ব্যাপার কি?
মাহতাব ম্লান হেসে বলল, বেড়াল তো মানুষের মতন অকৃতজ্ঞ হয় না৷ মানুষ বড় অকৃতজ্ঞ৷
- কিন্তু তুইও তো সেই মানুষই, মাহতাব! মহামানবও নোস, অতিমানবও নোস৷
মাহাতাব স্বীকার করল, তা তো ঠিকই৷
- ক্রটি তো তোরও হতে পরে ৷ পারে না?
- তা পারে বৈকি৷ পারে ৷
-নিজের মখুখানি মানুষ নিজে নিজে দেখতে পায় না, আর তা দেখতে হলে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়৷ আমার ধারণা তুই বড্ডো বাড়াবাড়ি করছিস৷
মাহতাব এবার নরম হয়ে এলো ৷ বলল, তাই যদি হয়, তাহলে আমাকে কী করতে হবে, বলে দে ৷
রওশন এক মুহুর্ত চিন্তা করে বলল, এখনই তা আমি বলতে পারছি না৷ তবে বলব, অপেক্ষা কর ।
গেন্দা চা বিষ্কুট দিয়ে গেল৷ মাহতাব একখানা বিষ্কুট হাতে নিয়ে বলল, তাই বলিস, এখন নে চা খা৷
রওশন খাবারে হাত দিল না৷ মুহুর্ত খানিক স্তব্ধ হয়ে বসে রইল৷ তারপর হঠাৎ করে প্রশ্ন করল, তোদের বিয়ের প্রধান উদ্যোক্তা কে ছিল, তোর মনে আছে?
মাহতাব চট করে বলে দিল, কেন, তুই?
- উদ্যোক্তা ছিলাম বটে কিন্তু সত্যি বলছি আমার ফারসাইট ছিল না। একথা আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, মেয়েটি উঁচু স্তরের মানুষ ছিল। তখন আমি বুঝতে পারিনি।
- তাই? বুঝলে কী করতিস?
- এ বিয়ের ব্যাপারে আমি এগোতাম না ৷
- তাহলে তো বেঁচে যেতাম, রে ৷
ঠাট্টা করিসনে মাহতাব ৷ তুই তাকে টেনে হিঁচড়ে নামতে গিয়েই সর্বনাশ করেছিস ৷
মাহতাব বন্ধুর কথায় রাগ করল না৷ শুধু তাচ্ছিল্য ভরে বলে উঠল, উঁচু স্তরের না কচু ৷ বদ্ব পাগল ৷ কমল্পিটলি আনএটজাস্টেবল.....
রওশন ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বলল, সেটাও অবশ্য একদিক দিয়ে ঠিকই বলেছিস৷ পাগল ভর্তি দেশে যদি একজন ভালো মানুষ এসে পড়ে, তাহলে দেশ শুদ্ব সবাই তাকে পাগলই ঠাউরায় ৷ ভালো লোকই তখন পাগল প্রমাণিত হয়৷ ঠিকই.....
মাহতাব বলল, তোকেও সে বশ করেছে , দেখছি৷ কিন্তু দোস্ত, বিয়েটা যদি তোমার সাথে হত, তাহলে টের পেতে হাড়ে হাড়ে ৷ টের পাও নি কিনা তাই অত দর্শন ঝাড়ছ ৷
রওশনের মনের মধ্যে চাপা রাগ উথলে উথলে উঠছিল৷ সে-রাগ সে গোপন করে শান্তভাবে বলল, মাহতাব, তুই আমার ক্লোজ বজমড ফ্রেণ্ড ৷ কী আমি বলব তোকে? সত্যি তোর জন্যে করুণা হয়৷ আবারও তোকে বলছি, তার লেভেলে ওঠার জন্যে তোর নিজেরই কোশেশ করা উচিৎ ছিল, সাধনা করার দরকার ছিল৷ তা না করে উল্টোটি করেছিস৷ তুই অমূল্য একটি রত্ন পায়ে ঠেলেছিস৷
মাহতাব বোকার মতন হাঁ করে রওশনের চোখের দিকে তাকিয়েছিল ঠিক সেই সময় হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল৷ উঠে দাঁড়িয়ে সে বলল, আবার কে এলো এখন? দাঁড়া, আমি দরজাটা খুলে দিয়ে আসি৷
দরজা খুলতে গিয়ে জিনিয়াকে দেখে মাহতাবের মুখখানি মুহুর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল৷
জিনিয়া প্রশ্ন করল, দরজা আগলে দাঁড়ালে যে? ভেতরে যেতে বারণ নাকি? মাহতাব ঠোঁটের ওপর লম্বা ভাবে ডান হাতের তর্জনি রেখে ছোট্ট একটা শিস দিয়ে বলল, একটা কাণ্ড ঘটে গেছে রে জিনিয়া ! আজ তুই ফিরে যা৷
- ভাবী কোথায়?
- আহা, আস্তে কথা বল৷ দারুন অসুবিধা আছে ৷ ভেতরে মানুষ রয়েছে ৷ তুই এখন ফিরে যা৷ পরে তোকে সব বলব৷
মাহতাবের কথা শুনে জিনিয়া মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে গেল ৷
ভয়ে চোখদুটি কেমন গোলগোল হয়ে উঠেছে ৷ ভয় জড়ানো গলায় বলল, ঠিক আছে, তাহলে যাচ্ছি৷ তুমি আমার ওখানে আসতে পারবে? আমারও কিছু জরুরী কথা আছে৷
- শিওর৷ এক্ষুনি আমি আসছি৷ তুই গেস্টরুমে থাকিস ৷ কোথাও যাসনে যেন৷
জিনিয়া দুড়দাড় করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নীচে নেমে গেল৷ মাহতাব আস্তে করে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে রওশনের কাছে ফিরে এসে দাঁড়াতেই রওশন প্রশ্ন করল, কে এসেছিল রে?
- একটা মেয়ে৷
- মেয়ে? কোন মেয়ে?
- আরে ধুর , কত মানুষ যে কত ধাঁন্দায় ঘুরছে, তার ঠিক- ঠিকানা আছে?
একটা অষ্টদশী কুমারী এই বাসাতে তার ভাবীর খোঁজে এসেছে৷ আচ্ছা বলত ,এখন কি করি ?আমি মরছি আমার জ্বালায়৷
- মানে ছাদে এসেছে উটের তালাশে, যত্তোসব৷
- বাসা ভুল করেছে বোধ হয়৷
- ভুল করেছে আবার! এসব হচ্ছে গিয়ে জেনে শুনে ভূল করা ৷ ঘরে ঢুকতে পারলে তখন আরো কত কী ভুল করত, কে জানে!
রওশন প্রতিবাদ করে বলল, তোর অনুমানটা সত্যি নাও তো হতে পারে৷ ছাড় ওসব কথা, আসল কথায় আয়৷
মাহতাব তাই-ই চায়৷ বলল, তাহলে এখন কী করা যায় বল দেখি? থানায় একটা ডাইরী করব? তাতে আবার কোন ল্যাঠা হবে কে জানে৷
- বরং এক কাজ কর৷
-কী?
দেশে ওর ভাই-এর বাসায় একটা খোঁজ নিয়ে দেখ ৷ সেখানে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী৷
-তাই করি ৷
- আমি এখন উঠি ৷ মেজবুর শরীরটা যদি একটু ভাল থাকে তবে আমিই বোঁ করে খবর দিয়ে আসতে পারব ৷ দেখি কী হয়৷ বলে রওশন উঠে দাঁড়াল৷
মাহতাব বলল, ঠিক আছে, যা ভাল হয় কর ৷ আমি তো কোন কিছুই ডিসাইড করতে পারছি না৷
মিটসুবিসি মিনিকারটি গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে মাহতাব হন হন করে গেস্টরুমে ঢুকে পড়ল ৷ সুপার মাহতাবকে জিনিয়ার অভিভাবক এবং বড় ভাই জানে বলে, তত্ত্ব-তালাশের জন্যে সে কোন সময় এখানে এলে কোন অসুবিধা হয় না৷ গতকাল শহরে যেসব মিছিল বেরিয়েছিল, পুলিশী হস্থক্ষেপ হয় বলে, পুলিশ-জনতার মধ্যে খণ্ড যুদ্ধ বেধে ওঠে ৷ পরিণতিতে তিন জন লোক মারা যায়৷ তার পরেই দারুণ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে ৷ শহরে একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি হয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ হয়ে যায়৷ জিনিয়াকেও তাই মুহুর্তে হোস্টেল ছাড়তে হচ্ছে ৷ সকালে সে মাহতাবের কাছ তাই নিয়ে পরার্মশ করতে গিয়েছিল৷
জিনিয়া চুপচাপ বসে ছিল৷ ওর রুমমেট সকালেই চলে গেছে ৷ এতক্ষণ মাহতাবের জন্যেই সে অপেক্ষা করছিল৷ মাহতাবকে দেখেই জিনিয়া উঠে দাঁড়াল৷
মাহতাব বলল, কিরে, রাগ করে ফায়ার হয়ে আছিস নাকি?
- ফায়ার হব কি? যে ভয় পাইয়ে দিয়েছ, বুকের ভেতর এখনও ঢিব ঢিব করছে৷ ব্যাপার কি মাতু ভাই? তোমাকে তো এ রকম করতে দেখি নি কখনো?
- ব্যাপার খুব গুরুতর! মাহতাব একখানি চেয়ার নিয়ে বসতে বসতে বল্ল, মাগীটা ভেগেছে।
- কোন মাগী?
তোমার রূপসী ভাবীটা৷
- জিনিয়া চমকে উঠল৷ ভেগেছে মানে? কোথায় গেছে?
- কোথায় গেছে জানলে কি আর ভেগেছে বলতাম?
জিনিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে অবাক হওয়ার ঘোর কাটলে মাহতাবকে জিজ্ঞেস করল, ভাবীর খোঁজ নাও নি?
- তা আবার নেই নি ? কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি!
- তা হলে?
- হয় মরেছে, নয়ত কারুর ঘরে গিয়ে উঠেছে৷
- কোথায় যেতে পারে বলে তোমার ধারণা হয়? জিনিয়া আবার প্রশ্ন করল৷
-এখন তো সব ধারণাই মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে ৷ ভেবেছিলাম তোর কাছে আসতে পারে ৷ এখন আর কোথায় যাবে? গেলে ওর ভাই-এর বাড়িতে গেছে৷
- স্ট্রেঞ্জ! জিনিয়ার অবাক কন্ঠে শব্দটি ধ্বনিত হল৷ এক মুহুর্ত স্তব্ধ হয়ে থেকে প্রশ্ন করল, হয়েছিল কি?
-হবে আবার কি? তার নাকি আমাকে পছন্দ হচ্ছে না৷
-বল কি ? পছন্দ হচ্ছে না? হঠাৎ?
- হঠাৎ কেন হবে? অনেকদিন ধরেই তো তার ভাব-সাবে বোঝা যাচ্ছিল ৷
কথাটা জিনিয়ার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ বলল, এটা ঠিক নয় মাতু ভাই৷ অন্তত আমি জানি, মুনীরা ভাবী তোমাকে কখনো অপছন্দ করেনি৷
- আমার বৌ আর আমার থেকে তুই-ই যখন সেটা বেশী জানিস তখন আমার আর কী বলার আছে?
জিনিয়া থতমত খেয়ে বলল, না না তা বলছি না ৷ অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে৷
- তুই তো সব জানিস না৷ ব্যাপারটা তোকে খুলেই বলি৷ সে আমাকে ভালবাসতো ঠিক৷ ভলোবাসতো মানে খুবই ভালোবাসতো ৷ তা আমিও স্বীকার করি৷ কিন্তু সে আমার কোন কাজই পছন্দ করত না৷ তাকে ডাইনে যেতে বললে সে যেত বায়ে৷ তুই বল, একে কি ভালোবাসা বলে?
জিনিয়া চুপ করে শুনতে লাগল৷
মাহতাব বলতে লাগল, সেই যে হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলাম, তারপর থেকেই সে একেবারে ভাম হয়ে গিয়েছিল৷
- তোমারও মাথায় যা ঘিলু৷ শুনেছিলাম খুব ট্যালেন্টেড ছাত্র ছিলে৷ কিন্তু মাথায় তোমার গোবর , বুঝেছ?
-তা তুই বোঝালে, বুঝব না কেন?
- বেশ, তাই বুঝে থাক ৷ আর শোনো, কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে৷ হোস্টেল ভ্যাকেন্ট করতে হচ্ছে৷ দেখতেই পাচ্ছ, প্রায় দরজায় তালা ঝুলছে৷ আমি আজকেই বাড়ি চলে যাচ্ছি৷
- বাড়ি কেন যাবি? বাসায় কেউ নেই ৷ বাসায় চল না?
- না বাড়িতেই যাব ৷ আমি গিয়েই তোমার সুমুন্দির বাসায় খোঁজ নেব ৷ তারপর সংবাদ যাই হোক, তোমাকে ফোন করে আজকেই জানিয়ে দেব৷ জিনিয়া এবার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, এখন সাতটা ছাব্বিস বাজে৷ তোমার অফিসের এখনও কিছু দেরি আছে?
- কেন, তা দিয়ে কী হবে?
- মিনিট পনেরোর জন্য একটা লিফট দিতে পারো? আমাকে তাহলে আর ধকল পোহাতে হয় না৷
- যাবার ব্যাপারে তাহলে ফাইনাল করেই বসে আছিস?
-হাঁ ৷ আমাকে তুমি বাস স্ট্যাণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে দাও৷
জিনিয়াকে বাসে তুলে দিয়ে নটার আগে মাহতাব অফিসে পৌছে গেল৷ এই বিরাট অফিস-বাড়িতে কয়েক শ কক্ষ আছে৷ তারই একটিতে মাহতাবও বসে৷ সুপিরিয়র সার্ভিসে কমপিট করার পর ডাইরেক্ট এ, এ, জিতে মাহতাবের পোস্টিং হয়েছে৷ ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের যুবকের জন্যে এ পদোন্নতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছের মতন হয়ে দেখা দিয়েছে ৷ মাহতাবের চলনে-বলনে সেই ভারিক্কি চালটি সহজেই ধরা পড়ে৷
No comments:
Post a Comment