Sunday, April 6, 2008

মুনিরা-৫

বাইরে থেকে ঢোকার মুখে ডাইনে আইল্যান্ডের মতন উঁচু জায়গা৷ তার ওপর কিছু হলুদ রঙের বিদেশী ফুল ফুটে আছে৷ মৌসুমী ফুল৷ সকালের রোদে ঝলমল করছে৷ তার পাশ ঘেঁষে গুটি কতক প্রাইভেট কার আছে দাঁড়িয়ে ৷ একপাশে মাহতাবের মিটসুবিসি মিনিকারটি সে পার্ক করে রাখল৷ তারপর দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে তর তর করে ওপরে উঠে গেল৷


অফিসের দরজার কাছে আসতেই মাহতাব দেখতে পেল মিস নন্দিতা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ৷ মাহতাবের ধারণা মেয়েটি সত্যি সত্যি গভীর জলের মাছ৷ নন্দিতাকে বুঝে ওঠা ওর জন্য কখনই সহজ ছিল না৷ আগে মাহতাবকে সে পাত্তাই দিত না কিন্তু যখন ওর পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হল, তারপর থেকেই সামনে পড়লেই নন্দিতা ডান হাতখানি কপালে ঠেকিয়ে হাসি মুখে সম্মান জানায়৷ কনগ্র্যাচুলেশনের জন্যে মেয়েটি একবার বাসাতেও গিয়েছিল৷ তারপর থেকেই মাহতাবকে সে একটু একটু পাত্তা দিচ্ছে ৷

মাহতাবকে সামনে দেখে নন্দিতা আজো ডান হাতখানি কপালে ঠেকিয়ে সম্ভাষণ জানাল৷ ঠোঁট দুটি ওর লাল টুকটুক করছে৷ সেকালে এই ঠোঁটের নাম ছিল তাম্বুল রাগ রঞ্জিত ওষ্ঠাধর৷ মুখের ভেতরটি কিন্তু সাদা ৷ নন্দিতার বয়স খুব বেশি নয়৷ এ-যুগের জীবন যাপনে তাকে বেশ অভ্যস্ত হতে হয়েছে৷ ঠোঁটের হাসি আর চোখের ইশারার কারণে বস থেকে শুরু করে কেরানী বেচারাদের পর্যন্ত- সবারই হৃদয়ে ও নাচানাচি করে৷ সবারই মনের মধ্যে সে যেন বাঁশী হয়ে বাজে৷ নন্দিতার নামের শেষে না আছে আহমদ, আর না আছে ঘোষ৷ সে যে কী বস্তু, ঠাহর করা অনেকের পক্ষেই দুঃসাধ্য ৷


নন্দিতা মাহতাবকে কেন যে পাত্তা দিত না তারও একটু খানি ইতিহাস আছে ৷ চাকুরীর প্রথম থেকেই সে এই অফিসে আছে৷ চাকুরীর উমেদারী থেকে শুরু করে পোক্ত করা পর্যন্ত যতগুলি স্তর সে পার হয়েছে, তাতে একমাত্র যে ব্যক্তি নন্দিতাকে সাহায্য করেছে তার নাম গজনফর আলী ৷ এই অফিসেরই একাউন্টস অফিসার ৷ চল্লেশোর্ধ এই ব্যক্তিটি কারণে অকারণে নন্দিতার প্রতি সর্বদা সহানুভূতিশীল ৷ অথচ সেই গজনফরের সাথেই এই অফিসে জয়েন করার প্রথম থেকেই মাহতাবের দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়৷ মাহতাব ছাত্র হিসেবে তুখোড় ছিল৷ সুপিরিয়র সার্ভিসে যে ভাল করবে, সেটা মাহতাব যেমন জানত, তেমনি অন্যদের ও জানতে বাকী ছিলনা৷ কিন্তু উপরি-আয়ের ব্যাপারে মাহতাব যে রকম আত্মকেন্দ্রিক ছিল, তার জন্যে অফিসের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার প্রতি ছিল অসন্তুষ্ট ৷ আর এই ব্যাপারে গজনফর আলীর নাম ছিল তালিকার শীর্ষে৷ পাশাপাশি হাঁটতে-চলতে গিয়ে এই সুন্দরী আধুনিকার সাথে মাহতাবের হৃদ্যতা ঘটতে বিলম্ব হওয়ার কথা নয় ৷ মাহতাবের আচরণে যেমন, নন্দিতার আচরণেও তেমনি তার অবাধ সুযোগটা ছিল, কিন্তু সেটা কাজে লাগাতে পারেনি একমাত্র ঐ গজনফর আলীর কারণে৷ শেষমেশ সেই গজনফর আলীও কী কারণে যেন নন্দিতার সুতোটা ইচ্ছে করেই ঢিল দিয়েছে আজকাল৷


নন্দিতা হিল্লোলিত শরীরে এগিয়ে এস সুরেলা গলায় জিজ্ঞেস করল, এখন কি কোন ডিক্টেশন দেবেন, স্যার?

মাহতাব সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, না৷

নন্দিতার মুখখানি হঠাৎ ফ্যাকসে হয়ে গেল৷ ডিক্টেশন না থাকলেও অন্যদিন মাহতাব নন্দিতাকে বলে, আরে বসুন না অমন তাড়াহুড়া করছেন কেন? তারপর কি রকম অদ্ভূত দৃষ্টিতে নন্দিতার দিকে সে তাকায়৷ দেখে নন্দিতারও চোখ-মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে৷ বস-এর হাসিমাখা মুখ নজরে পড়লে তরুনী স্টেনোদের ও রকম তো হয়েই থাকে৷


আজ মাহতাব ওকে সে-রকম সমাদর করতে পরছে না৷ মাহতাবের সাথে সহজ হবার পর থেকে কখনো তার এ ধরনের আচরণ নন্দিতা লক্ষ্য করেনি ৷ নন্দিতা জানে শুধু তাকে দেখেই নয়, কর্মোপজীবিনী যুবতীদের যেমন, খুরশীদা, রুখশানা, আইভী, রওশন আরা- যাকেই দেখুক না কেন, মাহতাব যে খুশী হয়ে ওঠে, তা তার চোখ দেখলেই আন্দাজ করা যায়৷ সরকারের অন্যান্য হাজারো ব্যাপারে সে সমালোচনা মুখর হলেও, এই একটি বিষয়ে সে খুবই খুশী৷ এই অফিস নামক বিরস মরুভূমিটাকে সরকার নন্দিতাদের নামিয়ে দিয়ে সুশ্যামল মরুদ্যান করে তুলেছেন ৷ অফিসে এখন অন্য রকম প্রাণ-চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হচ্ছে ৷ সাহেব-সুবোদের ঘরে ফেরার তাড়াহুড়োটাও বেশ কমে গেছে৷


আজ মাহতাবের মুড ছিল না৷ নন্দিতা কী করবে ভেবে না পেয়ে পাংশু মুখে দঁড়িয়ে রইল৷

মাহতাব বিমর্ষ মুখে বলল, আপনি একটু পরে আসুন৷ আমার মাথাটা বড্ডো ধরেছে৷

নন্দিতা উঁচু হিলের জুতোর ঠক ঠক আওয়াজ তুলে পাশের কামরায় যেতে যেতে নিজের মনে বস এর ওপর স্টেনোর যে নারী-সুলভ অভিমান হতে পারে, তা অনুভব করতে গিয়ে নন্দিতার মনটা ব্যথিত হয়ে উঠল৷

মাত্র মিনিট পাঁচেক পর নন্দিতা আবার ফিরে এসে বলল, স্যার৷

মাহতাব চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ দুটি বন্ধ করে কী ভাবছিল৷ ডাক শুনে চোখ খুলে বলল, কী?

- রাস্তায় দারুন গণ্ডগোল হয়েছে৷ পুলিশে গুলি চালিয়েছে ৷ শুনলাম, মিছিলের লোকজন বাসে বেধরক আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে৷

মাহতাবের মনে পরে গেল , আজ আবার বিরোধি দলগুলোর গত কালকের ঘটনার প্রতিবাদ মিছিলের কথা৷ অফিসে আসবার সময় মনে হয়েছিল বটে কিন্তু পরক্ষনেই তা সে ভুলে গিয়েছে৷ এখন কী করবে ঠিক করতে না পেরে নন্দিতাকে প্রশ্ন করল তাহলে?

রাস্তার লোক সব ছুটাছুটি করে ভাগছে৷ অফিসের লোকজনও কমে গেছে৷

- আপনি এখন কী করবেন? মাহতাব প্রশ্ন করল৷

- কী যে করব তাইতো ভাবছি৷ বাসায় ফিরতে পারলে খুব ভাল হত স্যার৷
অসুস্থ মা বাসায় একলা পড়ে আছেন ৷ বাতের রুগী৷ গোটা শরীরে রস নেমেছে৷ নড়াচড়াও তার উপায় নেই৷ মানুষজন যেমন করে আগুন নিয়ে খেলা করছে, ঘর-বাড়িতে লেগে গেলে কী ঘটে যাবে, মাগো বলতে বলতে নন্দিতা আঁৎকে উঠল৷

- কিন্তু এই গোলমালের ভেতরে যাবেন কেমন করে বলুন তো?

- কোন রকমে যেতে পারলেই ভাল হয়, স্যার ৷ আপনি বললে, একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি৷

নন্দিতার মুখের কথা মুখেই আছে, হঠাৎ দড়াম করে পটকাবাজির আওয়াজ শোনা গেল৷ অফিসে খুব বেশী লোকজন নেই কিন্তু আওয়াজ শুনে যারা ছিল, তাদের মধ্যেই চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল৷

মাহতাব চোখ দুটি গোল করে বলল, ৷ ঐ শুনুন বোমা পড়ছে৷ যেতে পারলে যান, আমি আপনাকে মানা করব না৷ কিন্তু যেতে গিয়ে আবার কোন বিপদে না পড়েন...

নন্দিতা বাস্তবিক ছটফচ করছে৷ বলল, বোমা ফাটছে পুব দিকে, আমি দক্ষিনের গেট দিয়ে ছুট দেব স্যার ৷ রাস্তাটা পার হতে পারলেই ... আচ্ছা আসি, স্যার ৷ বলে কপালে হাত তুলে নন্দিতা হুড়মুড় করে দৌড় দিল৷


নন্দিতাকে বিদায় দিয়ে দু-মিনিট মাহতাব চুপ করে বসে রইল৷ বাইরে যেমন, ভেতরেও ঠিক তেমনে আন্দোলন চলছে মাহতাবের৷ অনেকদিন এমন সিরিয়াস মাথাধরা সে লক্ষ্য করে নি৷ মাথাটা যেন ছিঁড়ে পড়ছে৷ এক কাপ গরম চা খেলে কী হত বলা যায় না৷ আকবরকে একবার ডাকতে পারলে হত৷ ওয়ারড্রবে থার্মাস আছে৷ গরম পানিটানি সবই রেডি৷ ছোকরাটি এক কাপ চা বানিয়ে দিতে পারত কি!


কলিংবেলে দু-দু বার বোতাম টিপে দিল মাহতাব৷ দু'বার টিপলেই পিয়ন আলী আকবর হুড়মুড় করে এসে পড়ে৷ এইটিই তার সঙ্কেত৷ কিন্তু এখন ছোকরার পাত্তা নাই ৷ চারদিকে মিছিলের ডামাডোলে তারও উত্সাহ এখন তুঙ্গে উঠেছে। মিছিল-টিছিল হলে আলী আকবার খুবই খুশী হয়ে ওঠে৷ ভাগ্যে যা থাকে হবে , শালার একঘেয়েমিত কাটবে৷ সব শালার সরকারই ভাত দেবার কেউ নয়, কিল মারবার গোঁসাই ৷ মিছিলের দাবড়ি না দিলে একবার যেই উড়ে এসে জুড়ে বসুক বসেই থাকবে৷ আলী আকবর চায়, সরকার আসুক আর যাক, বদ্ধ জলাশয়ের মতন যেন থিতিয়ে না বসে৷ তাহলে পঁচে গলে বদবুদ ছড়াবে না৷ সেই উত্সাহের আতিশয্যে সে হয়ত এখন ফর ফর করে উড়ছে ৷ মিছিল দেখলেই আকবরের মনটা নেচে ওঠে ৷ সুযোগ পেলেই মিছিলে ঢুকে পড়ে ৷ সুযোগ না থাকলে নিদেন পক্ষে জায়গা মতন দাঁড়িয়ে যায়৷ মিছিল দেখে সে চক্ষুরতন জুড়িয়ে নেয়৷ ব্যাটা বোধ হয় সেদিকেই গেছে এখন৷


বিরক্ত মুখে মাহতাব আকবরের অপেক্ষা করছে৷ হয়ত এক্ষুণি সে এসে যাবে৷ কিন্তু না, তার বদলে হনহন্- হয়ে ছুটে এলো নন্দিতা৷ কানের দুপাশের গুচ্ছ চুল কেটে ছেঁটে গালের পাশ দিয়ে সে ঝুলিয়ে রাখে৷ সেই চুল এখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উলুল ঝূলুল করছে৷ ভয় পেয়ে দৌড় দিয়েছে নন্দিতা৷ ঘন ঘন দম নিতে গিয়ে মুখ তার হা হয়ে গেছে৷


- ধুমাদুম দুজন মানুষকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখেলাম স্যার ৷ সব লোকজন এদিকেই ছুটে আসছে৷ গোলাগুলির ধোঁয়ায় পথ ঘাট একবারে অন্ধকার৷ হাঁপাতে হাঁপাতে কোনমতে কথাগুলি শেষ করল নন্দিতা ৷

তাহলে এখন কী হবে? মাহতাবের মুখেও সেই একই প্রশ্ন ৷ চেহারাও তার বিবর্ণ হয়ে গেছে

নন্দিতা চট করে বলে উঠল, দরজা বন্ধ করে দেই, স্যার৷ অন্তত দরজা ভেঙ্গে কেউ ঘরে ঢুকতে পারবে না৷ বলেই আর অপেক্ষা না করে নন্দিতা দরজার ভারি পাল্লা দুম করে বন্ধ করে দিয়েই ভেতর থেকে লক ঘুরিয়ে দিল৷

দুমুহুর্ত দুজনেই চুপচাপ৷ বাইরের হট্টগোল যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল৷ কয়েক মুহুর্তপর আবার তেমনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল৷ নন্দিতা বিমর্ষ মুখে মাহতাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ মাহতাব বসতে বলতেও ভুলে গেছে৷ হট্টগোল চলে যেতেই ওদের মুখের চেহারার পরিবর্তন হতে লাগল৷ মিছিল-টিছিল, বোমাবাজি-টোমাবাজির কথা শুনলে নন্দিতার যেমন, মাহতাবের ও তেমনি কেন যেন ভয় ভয় লাগে৷ কোথায় কী ঘটে যায় কে বলতে পারে!


মাহতাবের সম্বিত ফিরতেই নন্দিতাকে বলল, দাঁড়িয়ে কেন, বসুন৷ নন্দিতা বসতে বসতে বলল, আপনার মাথা ধরেছিল, স্যার ৷ এখন কেমন লাগছে?

- না হ, কমছে না৷ সাধারণত এমনটি হয় না৷ একটু-আধটু কখনো কখনো ধরলেও চট করে ভাল হয়ে যায়৷ এমন হেভী মাথাধরা জীবনে কখনো দেখিনি৷ আকবরকে ডাকলাম চোকরার পাত্তা পাওয়া গেল না৷ এককাপ চা খেয়ে দেখতাম, কিছু ভালো লাগত কিনা….

-আকবর? ওকে তো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এলাম, স্যার৷ গুলির আওয়াজ শুনে মিছিলের সব লোক যে যেদিকে পারছে ছত্রখান হয়ে ভাগছে৷ আর আকবর সদর গেটের শিক ধরে হাঁ করে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তামাশা দেখছে৷ পাই পাই করে গুলি ছুটছে, দৃকপাত নেই৷

- ব্যাটা বুদ্ধির ঢেঁকি তো ৷ গুলি খেয়ে মরবে৷ মরলে তখন শহীদের খাতায় নাম উঠে যাবে ৷

নন্দিতা বলল, আমিই চা করে আনি স্যার ৷ আনব?

- আপনি? মাহতাব অবাক হয়ে তাকাল নন্দিতার দিকে ৷ মুহুর্তে মাহতাবের এক ঝলক বিদুৎ প্রবাহ বয়ে গেল৷ এই মুহুর্তে মাহতাবের চোখে নন্দিতা সত্যি সত্যিই অপরূপ হয়ে উঠেছে৷ মাহতাব আপত্তি করে, না না, আপনি কেন কষ্ট করতে যাবেন?

নন্দিতা ফিক করে হিসে উঠে বলল, কষ্ট কিসের, স্যার? আমি চা তৈরী করতে জানি৷ আকবরের থেকে খুব একটা খারাপও হবে না, বলুন্ চায়ের সরঞ্জাম কোথায়?

- না না, এটা ঠিক হবে না৷

- আমার হাতে খেতে ঘৃনা হচ্ছে, স্যার? নন্দিতা এবার চোখের কোণা দিয়ে তাকল৷

- আরে বলেন কি? তা কেন হবে? না না, আপনি অযথা আমার জন্যে কষ্ট করবেন, সেটা আমার জন্যে কি.....

নন্দিতা বাধা দিয়ে বলল, চায়ের সরঞ্জাম কোথায় আছে?

- ঐ যে ঐ ওয়াড্রোবে ৷ থামুন আমি বের করে দিচ্ছি৷

আপনি রেস্ট নিন স্যার৷ এখন আমিই সব পারব ৷ কয়েক মিনিটের মধ্যেই নন্দিতা এক কাপ ধুমায়িত চা এনে মাহতাবের সামনে টেবিলের ওপর রেখে দিল৷

মাহতাব জিজ্ঞেস করল, আপনার কই?

নন্দিতা বলল, উরি বাবা৷ আমি কেন চা খাব, স্যার?

মাহতাব অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, মানে?

- আমার তো মাথা ধরেনি ৷ নন্দিতা অদ্ভুত ধরনের হাসি হেসে মাহতাবের দিকে তাকাল৷

মাহতাব প্রতিবাদ করে বলল, উহুঁ তা হবে না৷ আপনাকেও খেতে হবে৷ আর চা নেই? ফ্লাস্কে তো অনেক পানি এনেছিল ছোকরা?

- আছে, আমি বানাইনি৷

- তবে থাক, আসুন এতেই দুজনে শেয়ার করি৷ শীগগীর একটা কাপ নিয়ে আসুন৷

নন্দিতা ? আপত্তি করতে লাগল, না না, আমার চা লাগবে না স্যার৷ আপনি খেয়ে নিন৷

- ঠিক আছে আপনি বসুন ৷ বলেই মাহতাব নিজেই চেয়ার থেকে উঠে ড্রয়ার টেনে একটা কাপ বের করে আনল৷ তারপর চা ঢালতে ঢালতে বলল, আমি একলা খাব তা কি কখনো হয়?

নন্দিতা, আর না, অত না স্যার, সব যে আমার কাপেই ঢেলে দিলেন, বলে মাহতাব কে বাধা দিতে লাগল ৷ শেষে মাহতাবের একখানি হাত চেপে ধরে নিজের কাপ থেকে আরো খানিক চা মাহতাবের কাপে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল, আপনার মাথা ধরেছে৷ একটু বেশী না হলে মাথাটা ছাড়বে না৷


নন্দিতার নরম হাতের মধ্যে মাহতাবের হাতখানি ক্ষণিকের জন্যে আটকা পড়ে রইল৷ নন্দিতার হাতের পরশ মাহতাবের শরীরে অদ্ভুত শিহরন বইয়ে দিল৷ মাহতাবের কাছে ব্যাপারটি উপভোগ্য৷ কোন নতুন নারীর মধ্যে নতুনত্বের আস্বাদন তার কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠে ৷ এক একটি নারী দেহ তার কাছে ঠিক যেন একটি একটি রত্নদ্বীপ৷ একটির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য, অন্যটির থেকে সম্পুর্ন ভিন্ন৷



চা খাওয়া শেষ হলে নন্দিতা বলল, গোলমালটা গেছে, এখন বোধকারি যাওয়া যেতে পারে৷

মাহতাব বাইরের হট্টগোল এর দিকে এবার কান দিল৷ না, আওয়াজ-টাওয়াজ আর কানে আসছে না৷ বলল, আবার আর একটা শুরু হতে কতক্ষন?

নন্দিতা হঠাৎ বলে উঠল, দেশটার কী হল, স্যার? দিনকে দিনই দেশটা গোল্লায় যাচ্ছে ৷ সেই লিবারেশনের সময় থেকে শুনে আসছি, এইবার মধুর নহর বয়ে যাবে৷ কেউ সোনার বাংলা গড়বে, কেউ শোষণহীন বাংলা গড়বে , কেউ আবার নতুন বাংলা গড়বে৷ এক একজন আসছে আর ঘোষণা দিচ্ছে, আমাকে সিংহাসনে বসাও, আমি তোমাদের সব পেয়েছির দেশ বানিয়ে দিব৷ কিন্তু শেষামেশ হচ্ছে কী?

- হবে আর কী? যা হবার তাই হচ্ছে ৷ মাহতাব জবাব দিল ৷

- ভাল হবে কি, দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে আর পলিটিক্যাল পার্টিগুলো ও তাই৷ রক্তমাখা লাশের ওপর দিয়ে হেটে নেতারা সিংহাসনে যাবার পাঁয়তারা করছেন ৷ এই যে আজ রাস্তায় কতগুলো তরতাজা মানুষের লাশ পড়ে গেল৷ তাতে কার কী হবে? নেতাদের কী ক্ষতি বৃদ্ধি বলুন?

মাহতাব হেসে বলল, ওদের যে লাভ হবে না তা নয়৷ একটু পরেই দেখবেন ওরা নেতাদের কাধে সওয়ার হয়ে নগর প্রদক্ষিন করে বেড়াবে৷ নেতাদের কাঁধে চড়তে পারা চাট্টিখানি কথা?

নন্দিতা বলল, আপনি হাসির কথা বলছেন, স্যার ৷ কিন্তু সত্যি সত্যি বলুন তো ঐ যে মানুষগুলো মারা গেল , তাদের আয় উপার্জনের ওপর যারা নির্ভর করত, তাদের কী হবে? একজন মানুষকে সিংহাসনে বসানোর জন্য এই প্রাণ দেয়ার কি মানে হয়?

মাহতাব তেমনি হেসে বলল, নারী কভু নিজ দুগ্ধ নাহি করে পান, কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে করে পরে অন্নদান৷ ওদের বালবাচ্চারা পথে বসে বসুক, তাতে কী এসে যায়? রাজনীতির মহাত্মনদের ভাগ্যির শিকে তো ছিঁড়ে দিল ৷ যে দেশে লাশের রাজনীতি প্রধান ক্যাপিটাল, সে দেশে এই আত্মদান মহত্ব বৈকি৷

নন্দিতা বলল, যাই হোক স্যার , এই রাজনীতি দিয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন কখনো হবে না৷ বোতল বদলাচ্ছে কিন্তু মদতো ঠিকই আছে ৷ এক-একজন স্বয়ম্ভু ত্রাণর্কতা ডান্ডা হাতে অবতীর্ন হচ্ছেন ৷ তার খোলসে পুরনো সেই সব চামচারা ঢোকবার জন্য তো এক পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ তারাই দেশের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে ৷

মাহতাব বলল, আপনি কিছু কিছু চিন্তা-ভাবনা করেন দেখছি৷ আমার আবার ঐ ভাবনা টাবনা নেই ৷ মরুকগে আপনার জাতি আপনি বাঁচলে বাপের নাম৷

নন্দিতা সমর্থন দিয়ে বলল, ভালই করেছেন, স্যার৷

মাহতাব এর বাসার কথা মনে পড়ে গেল ৷ নন্দিতার সাথে খোশ গল্প করতে গিয়ে তার সব কিছুই ভুল হয়ে গেছে ৷ বলল, এখন কী করবেন? মনে হচ্ছে, গোলমাল থেমে গেছে৷

- তাহলে চলুন স্যার যাওয়া যাক৷

অফিসের লোকজন প্রায়ই চলে গেছে ৷ দু-চারজন দাড়োয়ান শুধু এদিকে সেদিকে ঘুরছে ৷ ওরা বইরে এসে দেখল, সারি-সারি পার্ক করা গাড়ি গুলো বিলকুল উধাও ৷ মাহতাবের গাড়িটি শুধু একপাশে কাছিমের মতন ঘাপটি মেরে রয়েছে ৷


মাহতাব জিজ্ঞেস করল, কিসে যাবেন?

নন্দিতা হতাশ গলায় বলল, তাইতো ! রিকসা টিকসা তো একটাও দেখছি না৷ সব বোধকরি ভেগেছে ৷ যাকগে, হেটেই যাবো, স্যার৷

মাহতাব বলল, হেঁটে যাবেন? যদি কিছু মনে না করেন, আমার তো গাড়ি আছে ৷ আপনি যেতে চাইলে ....

- মনে করব কেন স্যার? কিন্তু আপনাকে আবার উল্টে পথে যেতে হবে। না থাক স্যার ৷ অনেক ধন্যবাদ!

মাহতাব বলল, দেখুন , উল্টোপথ বলে আমার কোন অসুবিধা হবে না৷ আপনি খারাপ না মনে করলে , আমি বরং আপনাকে পৌঁছে দিতে পারলে খুশিই হব! এই রকম গাড়ি- ঘোড়াহীন-পথে আপনি নিঃসঙ্গ হেটে যাবেন ভেবে আমার খুব খারাপ লাগছে৷


নন্দিতা একমুহুর্ত ইতস্তত করল৷ তারপর গাড়ির সামনের দরজা খুলে উঠে এসে মাহতাবের পাশে বসে গেল৷ চাবি ঘুরিযে স্ট্রাট দিতেই মিটসুবিসি মিনিকারটি থর থর কেঁপে উঠে সামনের দিকে ছুটে চলল৷


নন্দিতাকে ওর বাসার পথে নামিয়ে দিয়ে মাহতাবের আজকের এই মুহূর্তটি হয়ে উঠল গন্তব্যহীন ৷ সারাদিন টো- টো করে ঘুরে যখন সে বাসায় ফিরল, রাত তখন আটটা বেজে গেছে। জামা-কাপড় খুলতে না খুলতেই হঠাৎ ক্রিং ক্রিং করে ফোনে রিং হতে লাগল।


মাহতাব রিসিভারটা কানে তুলে, হ্যাল্লো কে? জিনি?

- হ্যাঁ ।

- কী খবর?

- মুনীরা ভাবী ওর ভায়ের বাসায় যায় নি৷

- যায় নি?

- না৷

মাহতাব ক্লান্ত কন্ঠে কী যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই যান্ত্রিক গোলযোগের কারনে সংযোগটা বিছিন্ন হয়ে গেল৷ মাহতাব বিষন্ন মুখে রিসিবারটা নামিয়ে রাখল৷




সদর দরজা খুলতেই আসমা বেগম অবাক হয়ে গেলেন৷ তিনি যেন তার চোখে দুটিকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছেনা ৷ বিষ্ময় মেশানো গলায় বললেন, ওমা কে, রে! মনি? এই সাত-সকালে কোথা থেকে আসছিস তুই? তোর সাথে ও মেয়ে টি কে? মাহতাব কোথায়? এক সঙ্গে প্রশ্নের ফুলঝুরি ফুটতে লাগল আসমা বেগমের মুখে৷


- সব বলছি ভেতরে চল৷ বলে মুনীরা দরজা পার হয়ে ভেতরে গিয়ে দাঁড়াল ৷

আসমা বেগম খুশী হয়ে উঠলেন৷ বললেন, চল্ চল্ ভেতরেই চল্, দাঁড়া ওপাশের সিটকানিটা খুলে দিই ..

-সিটকিনি খুলতে হবে না৷ সঙ্গে আর কেউ নেই৷ আমরা ভেতরেই বসতে পারব৷ বলেই আসমা বেগমের পেছনে পেছনে ওরা ভেতরে ঢুকল৷ মাঝের ঘরের খাটে ওদের বসিয়ে আসমা বেগম বললেন, ওকে তো চিনতে পারছিনা, মনি৷

- পরিচয় দিলেই তখন তুমি চিনতে পারবে, ভাবী৷

- তাহলে দে পরিচয়৷

মুনীরা বলর, যশোরের সেই হাকিম সাহেবের কথা তোমার মনে আছে ভাবী? সেই যে আহসান সাহেব? এখান থেকে বদলী হয়ে যিনি কুমিল্লা গেলেন? মনে পড়ে?

- তা পড়বে না কেন? তবে সে তো অনেক আগের কথা ৷

মুনীরা এবার ভাবীকে পরীক্ষা করবার জন্যে বলল, তাঁর সম্পর্কে তোমার আর কী মনে আছে বল তো শুনি?

আসমা হেসে উঠলেন , কী আর মনে থাকবে? তাঁর দুটি মেয়ে ছিল, হাসি আর খুসি, হাসি ছিল তোর জুটি৷

মুনীরা আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠে বলল, সাব্বাস, তুমি সত্যি দারুন মনে রাখতে পারো ভাবী৷ এ তোমার সেই হাসি৷ দেখো চিনতে পারো কিনা৷

হাসিনাও এবার কথা বলল, সেই যে পুচকি মেয়েটি একদিন আপনার হাতে কইমাছ দিয়ে ভাত খেতে গিয়ে গলায় কাঁটা ফুটে সারা বাড়ি তোলপাড় করেছিল৷ মনে পড়েছে ভাবী?

আসমা বেগম হাসিনার চিবুকে হাত দিয়ে বললে, উরিব্বাসরে , সেই হাসি তুমি কতো বড়োটি হয়েছ? একটুও চিনবার জো নেই৷ কী করে চিনব? কতকাল পরে দেখা, বলদিখিনি? সে কি তোমার আজকের কথা ?

হাসিনা হেসে বলল, আমরা হিসেব করে দেখেছি, ভাবী৷ প্রায় এক যুগের মতন সময়ের ব্যপার৷

আসমা বেগম বললেন, তা একযুগ তো হবেই, আরো বেশিই হবে হয়ত৷

সেই খুশিটার খবর? ঐ যে ছোট্ট মেয়েটি ফুট ফুটে সুন্দর৷ রাগ হলে ত্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো চোখ পাকড়ে?

- সেও এখন বড় হয়ে গেছে ৷

- বিয়ে থা-ও হয়েছে নাকি?

- নাহ্ !

- কী করে সে এখন?

- পড়াশোনা করে ৷ বি,এ, জি ফাস্ট ইয়ারে এডমিশন নিয়েছে৷

- বি,এ,জি মানে কৃষি বিশ্ববিদ্যলিয়ে?

- হ্যাঁ৷

- কিন্তু ও তো মেয়ে মানুষ, কৃষি-বিদ্যা পড়তে গেল কোন দুঃখে?

- এখন মেয়েরা কত কি করছে, ভাবী৷ কৃষি-বিদ্যা তো কৃষি-বিদ্যা, ডাকাতি বিদ্যাতেও এখন মেয়েরা পাকা পোক্ত হয়ে উঠেছে ৷ পুরুষদেরও টেক্কা দিচ্ছে ৷ মেয়েরা এখন আর মেয়ে মানুষ নেই পুরুষেরও বাবা হয়ে যাচ্ছে যে৷

- ওরে বাবা, বল কি, পুরুষেরও বাবা! বাবা হতে গেলেই তো সর্বনাশ হবে ৷

বলেই আসমা বেগম হেসে উঠলেন৷ হাসি থামলে বললেন, কিন্তু মাহতাব কোথায় গেল? আসছে না যে?

মুনীরা বলল, সে তো আসেনি ভাবী৷

আসমা বেগম অবাক হয়ে গেলেন ৷ আসে নি মানে? তুই কি একলাই এসেছিস নাকি?

হাসিনা মুনীরার হয়ে জবাব দিল, একলা হল কী করে ভাবী মনি আমার সঙ্গ পেল বলেই তো এলো ৷ ওর হাজবেন্ডের কোন ফুসরৎ আছে নাকি? অফিস ছুটি হলে, তখন একটা না একটা সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান লেগেই আছে৷ বৌকে নিয়ে আপনার বাড়িতে আসার তার সময় কোথায় ?

আসমা বেগম হাসিনার কথায় খানিকটা নিশ্চিত হলেন৷ বললেন, তোর ভাইজান বেশ কিছুদিন থেকে যাব-যাব করছে৷ দিনাজপুরে একটা কাজ নিয়ে পড়েছে। আজ সাত মাস সেই ইরিগেশন প্রজেক্টে লাগাতার কাজ চলছে ৷ দিন নেই রাত নেই চব্বিশ ঘন্টাই বলতে গেলে ব্যাস্ত ৷ বাসাতেও বড় একটা আসতে পারেনা, সময় কোথায় যে আসবে? কাজে কর্মে যারা ফাঁকি দিতে পারে তাদের হাতে অঢেল সময় ৷ তারা কাটাতেও পারে আরামে ৷ কিন্তু তোরা তো জানিস,ঐ মানুষটা অন্য ধাতুতে গড়া ৷ খাটতে-খাটতে একেবারে মরে গেল বেচারা৷


হাসিনা বলল, ভাইজান যে ধরনের সিরিয়াস টাইপের ইনজিনিয়ার, তাঁর মতন গুটি কতক ইনজিনিয়ার এদেশে থাকলে দেশের ভাগ্যই ফিরে যেত ৷ তা তো নয়৷ গোটা দেশের টেকনিক্যাল হ্যাণ্ডগুলি দেশগড়া নয়, শুধু দস্তখত দেবার চাকরী করে ৷ ওদিকে যে-লোকটি অসৎ হতে পারে না, তার ঘারেই খাটুনি চাপে৷ আর ফাঁকিবাজরা তাস পিটিয়ে সময় কাটায়৷ মাস গেলে পুরো মাইনেটা গুনে-গেঁথে হাতে পেলেই মিটে গেল৷ আর কী চাই?


আসমা বেগম চট করে প্রসঙ্গ পাল্টালেন, হাসিনার ছেলে পুলে কী?

হাসিনা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল৷

আসমা বেগম ওকে চুপ থাকতে দেখে বললেন, কী ব্যাপার তোমারও বিয়ে হয়নি নাকি?

হাসিনা লজ্জিত মুখে বলল, বিয়ে হয়েছে৷

- কত দিন হল?

- গত ফাল্গুনের আগের ফাল্গুনে৷

- তোমার বর কী করে?

হাসিনা হেসে বলল, সেও আমাদের ভাইজানের মতন একজন ইনজিনিয়ার ৷

- তাই নাকি? বেশ তো৷ কোথায় কাজ করে ?

- ওয়াপদায়৷ ভাইজানের একই ডিপার্টমেন্ট ৷

- তোমার ভাইজানের সাথে জানা-শোনা নেই?

- আমি আগে তো জানতাম না, আলাপ করে দেখিনি৷ জানা থাকবে হয়ত৷

- ওকে সাথে করে আনলেই পারতে?

হাসিনা বলল, সেও ভাইজানের মতনই কাজ পাগল৷ তারও এখন হতে খুব কাজ৷ এখন তো দেখা-শোনা হয়ে গেল৷ একদিন সাথে করে এসে বেড়িয়ে যাব ৷

- তাই যেও৷ বলেই আসমা বেগম আবার বললেন, মাহতাবের সাথে তোমারও দেখা-শোনা হয় নাকি?

হাসিনা ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটা এড়িয়ে বলে উঠল, ভাবীর ফ্রিজটা তো বেশ বড়৷ নতুন মডেলের মনে হচ্ছে! সুন্দর জিনিস তো!

- হলে কী হবে? তোমার ভাইজানকে সেই কতকাল থেকে বলতে বলতে এতদিনে ঐ জিনিসটা পাওয়া গেল৷ কিন্তু কোন জিনিস রেখে মোটেই শান্তি- নেই, ভাই৷

- কেন?

- ঠিক মতন কারেন্ট থাকে নাকি? জিনিসপত্র রাখলে প্রায় পঁচে যায়৷ আজাকালকার বাজারে জিনিসপত্র পঁচে গেলে কি সহ্য করা যায়?

- খুব লোডশেডিং হয় বুঝি?

- মাঝে মাঝে আটচল্লিশ ঘন্টাও কারেন্ট থাকে না৷ তাছাড়া এক-আধ ঘন্টা লুকোচুরি তো লেগেই আছে ৷ লোডশেডিং কাকে বলে, জানি?

আসমা বেগমের চিন্তাটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে পেরেছে ভেবে হাসিনা মনে মনে খুশী হয়ে উঠল৷ এখন থেকে সতর্ক হয়ে কথা বলতে হবে বলেও মনে মনে স্থির করে নিল৷

মুনীরা এতক্ষণ খাটের বাজুতে হেলান দিয়ে ওদের কথোপকথন শুনছিল৷

আসমা বেগম ওর দিকে চেয়ে বললেন, তোর শরীর তো বেজায় খারাপ হয়ে গেছে রে, মনি? ব্যাপার কী? শুনি নাকি বিয়ের পর মেয়েদের শরীর ভাল হয়৷ আর তুই যে দিনকে দিন শুকিয়েই গেলি৷

মুনীরা হেসে ফেলল, তোমরা সারা জীবন আমাকে শুকিয়ে যেতে দেখেছ, ভাবী। জানিনে বাবা, আমার শরীরের দোষ না তোমাদের চোখের দোষ।

- না রে সত্যিই বলছি, তুই খুবই শুকিয়ে গেছিস,মনি ৷

- জন্ম অব্দি ভাই আর তুমি আমাকে যেভাবে রাতদিন শুকিয়ে যেতে দেখছ, তা যদি সত্যি হত, তাহলে এ-শরীর এতদিনে সুতোর মতনও থাকার কথা নয়৷ কিন্তু হিসেব করে দেখো, দিন-দিন কেবল আমি ধুমসো হয়েই উঠছি৷ বলতেই সবাই এবার খিলখিল করে হেসে উঠল৷

ওদের বসতে দিয়ে আসমা বেগম রান্নার তদারকিতে চলে গেলেন৷ এই ফুরসতে দু'জন আবার আলাপ শুরু করল ৷ হাসিনা বলল, ড্রামার ফার্স্ট সিনটা খুব চমত্কার ভাবে উত্রে গেছে, তাই না?

মুনীরা বলল, কিন্তু আসল রোল যখন আসবে, তখন নায়িকা একেবারেই ভরাডুবি করে ছাড়বে, দিখিস৷

হাসিনা বলল, আরে ধুস , তা হবে কেন?

মুনীরা হেসে উঠল৷ বলল, হবে, কারণ নায়িকাটা হচ্ছে এক নম্বরের আনাড়ী৷

- নারে না৷ তোকে ভাই শক্ত হতেই হবে৷ প্রথম চোটেইঁ ওরা হকচকিয়ে গেলে একেবারে পেরেশান হয়ে পড়বেন ৷ সেটা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না ৷ একদিন অবশ্যি থলের বেড়াল বেরিয়ে পড়বেই ৷ তবে সেটা গ্র্যাজুয়ালী হোক৷

- তাই বলে মিথ্যে বলতে হবে?

- মিথ্যে বলবি কেন? অনেক জিনিস বুদ্ধি করে এড়িয়ে যাওয়া যায় ৷ দেখলি না তোর হাজবেণ্ডের কথা উঠেতেই সেটা আমি কেমন ভাবে এড়িয়ে গেলাম? এটা একটা টেকনিক ৷ তাতে সত্যি বলবার তিক্ততা থেকে বাঁচবি, আবার মিথ্যে ও বলা হবে না ৷
মুনীরা হেসে বলল, ওটা করতে গেলে চালাক-চতুর হতে হয় ৷ জানিস তো আমি কেমন হাবা মেয়ে?

- ঠেলায় পড়লে তখন ঠিকই বুদ্ধি খুলে যাবে দেখিস ৷

সকাল থেকেই আকাশটা আজ মেঘলা মেঘলা ছিল ৷ ছন্নছাড়া একদল মেঘ আকাশের বুকে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় সুর্যটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল৷ উটকো দমকা বাতাস উঠেতেই মেঘগুলি হাওয়া দিল ৷ উজ্জল কাঁচা-কাঁচা রোদ শার্সি গলে ঘরে ঢুকল ৷ দক্ষিনের জানালার ধার ঘেঁষে বাতাবী লেবুর গাছ৷ তার ঘন সবুজ পাতার ভেতর একটা পাতি ঘুঘু এতক্ষণ একটানা সুরে ঘুঘু ডাকছিল ৷ দমকা হাওয়ায় ওর পালকগুলি চুলবুলিয়ে উঠতেই পাখিটি মুনীরার চোখের ওপরই ডাক ভুলে নিশ্চুপ হয়ে গেল৷


স্বামীর বিলাসপুরী থেকে চলে আসার পর মুরীরার মন জুড়ে প্রবল অস্থীরতা বিরাজমান ছিল৷ তার ফলাফল কতদূর পৌঁছবে, তা তার জানা নেই৷ জানার আগ্রহও ছিল না৷ ভাই ভাবী যখন জানবে, কী ভাবে গ্রহন করবে, সেটাও এতক্ষণ সমস্যার মতন হয়ে তার চেতনায় হাতুড়ীর আঘাত করছিল৷ তাও যেন এখন অনেকখানি সহনীয় হয়ে আসছে৷ মনে তো অনেক কথাই আসে৷ মুনীরার এই সিদ্ধান্ত মুজাফফর যদি গ্রহণযোগ্য মনে করেন, তাহলে তার পরিণতি কী হবে? হয়ত সেই পরিত্যক্ত জায়গাতেই তাকে ফিরে যাবার জন্যে তিনি আদেশ দিয়ে বসবেন ৷ অথচ সেখানে ফিরে যাওয়া কত বড় অসম্ভব ব্যাপার, হয়ত ভাইজান অনুমানও করতে পারবেন না৷ সেই অসহনীয় কাণ্ডটা যদি তার চোখের উপর ঘটত, তিনি যদি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করতেন, তাহলে সেটা হত ভিন্ন কথা৷ তিনি সহজেই তখন বুঝতে পারতেন৷ সব কিছুর গভীরতা প্রত্যক্ষদর্শীর মতন অন্যের পক্ষে বোঝা কি সহজ হয়?


মাহতাবের কর্ম্যকাণ্ড প্রতি মুহুর্তেই মুনীরার মানস চোখে ভেসে উঠছে৷ এক একটা দিন গেছে মুনীরাকে টেনে টেনে নীচে নামানোর জন্যে সে সংগ্রাম করেছে ৷ স্বামীর ছোট খাট অনেক অন্যায় দাবিও তাকে অনেক সময় মেনে নিতে হয়েছে ৷ কিন্তু সেই রাতের ঘটনাটি মুনীরা কিছুতেই গ্রহণ করে নিতে পারেনি৷ তার স্বামী পরস্ত্রীর কোমর ধরে নাচবে এবং তাকেও পর পরুষের কোমর ধরতে হবে, তা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি৷ মুনীরা এই মিথ্যা সভ্যতার মুখে লাথি মেরে সেদিন আত্নসম্মান বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছে৷ আর তারপরই মাহতাবের প্রতি তার সমস্ত- শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ৷ আপন স্ত্রীকে যে স্বামী বারবণিতা বানাতে চায়, তার সংসার থেকে আত্মরক্ষা করা ছাড়া মুনীরার কী উপায় ছিল? স্বামী হিসাবে তাকে ভালবাসা কোনক্রমেই কি সম্ভব? আজ কতদিন ধরে এই নিয়ে বিবেকের নখরাঘাতে মুনীরার হৃদয় খানি প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছে ৷ হাসিনার আশ্বাস তাকে অনেকখানি সাহস জুগিয়েছে বটে, কিন্তু তবু ভাইজানের সিদ্ধান্তই আসল ৷


হাসিনা বুক শেল্ফ থেকে একখানি বই টেনে নিয়ে এখন মনোযোগ দিয়ে পড়ছে ৷ হাসিনাকে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে দেখে মুনীরা আস্তে করে উঠে কিচেনের দরজার পাশে গিয়ে দাড়াল৷


আসমা বেগম ওকে দেখতে পেয়ে বললেন , আয় বস এখানে ৷ বুকের ভেতরে তোলপার করা -ঝড়কে আস্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে রেখে মুনীরা ভাবীর কাছে একখানি পিড়ি পেতে বসে পড়ল৷

আসমা বেগম খুন্তি-দিয়ে কড়াই-এর ভাজিটা উল্টে দিলেন ৷ তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ওখানে তোর ভাল লাগছে রে মনি?
মুনীরা হেসে জবাব দিল, ভাল লাগবে না কেন? রাজধানী শহর কার না ভাল লাগে, ভাবী?

আসমা বেগম আশ্বস্ত হয়ে বললেন, বেশ , ভাল লাগলেই ভাল! বলেই তিনি মুনীরার মুখের দিকে ভাল করে দেখে নিলেন ৷ তারপর বললেন , এখান থেকে তোরা যখন চলে যাস, তোর ভাইজান তখন বেশ খানিক দুশ্চিন্তায় পড়েছিল৷

- কেন, দুশ্চিন্তা কেন?

- তোর ভাইজান ভাবছিল, মাহতাব আবার রাগ টাগ করে গেল নাকি?

- তার জন্যে ভাইজানের দুশ্চিন্তা হবে কেন? ভাই জান কি ওর ধার ধারেন?

আসমা বেগম মৃদু হাসলেন, ওমা, বলিস কি মনি? বোন দিয়েছে তার হাতে, ধার ধারবে না মানে? ভগ্নিপতিকে যে মাথায় রাখতে হয়৷

মুনীরার মনটা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠছিল৷ মন চায় একবার বলে, ওকে আবার মাথায় করে রাখা ! কিন্তু সে- কথা সে গোপন করে বলল, কারুর ভাইকে তো ও রকম করতে দেখি না, আমার ভাইজানই ঐ রকম করেন৷

আসমা বেগম কথার প্রতি উত্তর করতে গিয়ে কেমন যেন হয়ে গেলেন৷ এক মুহর্ত চুপ করে কি যেন ভাবলেন৷ তারপর বললেন, তুই ঠিকই ধরেছিস রে, মনি৷ তোর ভাই আর যাই হোক মনি বলতেই অজ্ঞান৷ হবে না? আসমা বেগম থামলেন৷ তারপর বললেন, একটা কথা বলি শোন, আমি যখন প্রথম দিন এ বাড়িতে বৌ হয়ে আসি, তখন তুই একেবারে গ্যাদা, ধর, আট- ন'মাসের শিশু৷ তোর ভাই সবার আগে ঘরে ঢুকে দোলনা থেকে তোকে তুলে বুকে করে এনে আমার কোলে দিয়ে বলেছিল, একে তুমি নাও, বেগম৷

No comments: