Sunday, April 6, 2008

মুনিরা-৩

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বেটে। কিন্তু শান্তির ঘুম হয়নি। কেন যেন আমার সবসময় আমার গা ছম ছম করছিল ৷ ঐ জায়গাটাই আমার কাছে খুব খারাপ লাগছিল ৷

- তোমার অভ্যেস নেই বলেই। কই আমার তো খারাপ লাগেনা?

মুনিরা এবার মাহতাবের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, আচ্ছা ঐ যে ধুমসি মেয়ে মানুষটা এভাবে বেদম নাচল, ওটাও কি তোমার ভাল লাগল ?

- হুঁ,-খু-ব এক্সেলেন্ট ৷ মাহতাব সিগারেটের ধোয়া দিয়ে একটি রিং তৈরি করে বাতাসে ছেড়ে দিল ৷

-ঐ মেয়েটারই বা কি আক্কেল গো ? মেয়ে মানুষ এত বেশী বেহায়া হয়ে গেছে ? ছিঃ ছিঃ ঘেন্নায় মরে যাই৷

- ওটাতো যুগের চাহিদা ৷ তুমি একলা ঘেন্না করে কি হবে ?

মুনিরা যেন শুনতেই পায়নি সে কথা ৷ আপন মনে প্রশ্ন করতে লাগল, টাকার বিনিময়ে যারা দেহ দেয় তাদের বলে পতিতা ৷ আর যারা টাকার বদলে রপ যৌবন প্রদর্শন করে তাদের নাম কি গো ?

তাদের ? মাহতাব ঢুক গিলে শব্দটা তালাশ করতে লাগল ৷

- মুনীরা খোঁচা দিয়ে বলল, তুমিতো তুখোড় ছাত্র ছিলে, বলতে এত দেরি হচ্ছে কেন ?

- মাহতাব বলল ওদের তো বলে শিল্পী৷

- শিল্পী ? তাহলে যারা দেহ ব্যাবসা করে তারাই বা শিল্পী হবেনা কেন ? তারা দেহ -শিল্পী ৷ আর ওরা ? ওরা হবে রূপ-শিল্পী ৷ দুই দল-একটাদেহ -শিল্পী আর একটা রূপ -শিল্পী ৷

মাহতাব মাথা চুলকিয়ে বলল, শুনি আগে নাকি সিনেমা থিয়েটারে ঐ সব মেয়ে মানুষেরাই করত ৷ পরে ভাল ঘরের মেয়েরা ধীরে ধীরে ...

মুনীরা কথা কেড়ে নিয়ে বলল, এখন ভাল ঘরের মেয়েরাও দেহ শিল্পী হচ্ছে মুনীরা ভাবী বলছিলেন, ওরা হোটেলে বারে ভাড়া খেটে টু পাইস রোজগার করে ৷ জানো, সত্যি কথা বলতে কি, এসবই বিকার ৷ এসবই বিকৃতি ৷


- তুমি দিন দিন খুবই ক্রিটিক হয়ে উঠছ, দেখছি ৷

মুনীরা হাসি মুখে বলল, ওরা সবাই সেই প্রমোদবালা ৷ কবির ভাষায় যাকে বলে জনপদবধু ৷ কেউ করে মনোরঞ্জন, কেউ করে দেহরঞ্জন ৷ পার্থক্য তো শুধু এইটুকুই ৷ দেখেছে সেই ধুমসি মাগীর কোমর দোলানো ধুন্ধুমার নাচ? সেই নাচ দেখে হল ভর্তি মাতাল মানুষ-গুলো কেমন বার বার শিস্ দিয়ে হই চই করে উঠছিল ? এটাও তো সেই সুড়সুড়ি ৷ সুড়সুড়ি নয় ?


তুমি তাহলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও সবকিছু দেখছিলে, দেখছি ৷ ডুবে ডুবে জল খাওয়া ?


- দেখাতেই তো নিয়ে গেছ, দেখব না ? ঐ মাগীটার নাম কি গো ?

মাহতাব হেসে বলল, কেন ওর মন্ডুটা চিবিয়ে খাবে নাকি ? ও ওপর খুব রেগেছ দেখছি ৷ মাহতাব ওর নামটা বলে দিয়ে বলল, দেখো ঐ বেচারীকে শাপ শাপান্ত করে মেরে ফেলো না যেন ৷ ওর অনেক অনেক ভক্ত আছে ৷ তারাও শেষ পর্যন্ত মারা পড়বে ৷


- আগে তুমিই মারা পরবে মনে হচ্ছে ৷ তাতে আমারই যে ক্ষতি ৷ সুতরাং নিশ্চিত থাকো আমি আর শাপ শাপান্ত করতে যাচ্ছি না ৷ কিন্তু নামটা দেখছি মুসলমান মেয়ের ?

-মুসলমানই তো ৷ এখন টাকা পয়সা রোজগার করে বুড়ো বয়সে হজ্জে গেলেই পাক্কা মুসলমান হয়ে যাবে ৷ এরকম অনেকেই তো যাচ্ছে ৷

- বিষ্টা দিয়ে হালুয়া বানানোর চেষ্টা ৷ ওতে খাদ্য তৈরী হয় না ৷ মরনের পর মাগীরা হাড়ে হাড়ে টের পাবে৷

এতক্ষন রসিকতা করতে মাহতাবের মন্দ লাগছিল না ৷ কিন্তু মুনীরার শেষ কথা শুনে হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল ৷ বলল, মরনের কথা ছাড়ো ৷ ওসব কথা কখনো আমাকে শুনাবে না, বলছি ৷


মুনীরা হেসে উঠে বলল, আমি না শোনালেও সেটা রোধ করা যাবে না গো ৷ সেটাই তো আল্লার রশি ৷ সেই রশি দিয়েই আল্লাহ এক এক জনকে পাকড়ও করেন ৷

ওদের কথার মাঝখানে হঠাৎ টং করে কলিং বেলটা বেজে উঠল ৷

মাহতাব বলল, কে এলো দেখো ৷

মুনীরা বার দুই গেন্দাকে ডাকল। কোন উত্তর পেল না। মাহতাব বলল, তুমিই খুলে দাও না।

মুনীরা উঠে গিয়ে সিটকিনিটা খুলতে গিয়েই দেখল, একজন প্রৌঢ় মানুষ। তাঁর পিছনে অজন্তা স্টাইলে শাড়ী পড়া একজন উনিশ কুড়ি বছরের তরুণী। পৌঢ় লোকটির মাথায় কাঁচা পাকা চুল। মুখে শুভ্র আবক্ষ দাড়ি। তাঁকে দেখেই মুনীরা তড়িঘড়ি দড়জার পাশে সরে দাঁড়ালো।


ভদ্রলোকটি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি মাহতাব উদ্দিনের বাসা?

মুনীরা অনুচ্চ স্বরে বলল, জ্বি হ্যাঁ।

ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে থাকা মেয়টির উদ্দেশ্যে বললেন, এই জিনি, এই মেয়েটাই আমাদের বৌমা। তোর ভাবী। যা সালাম কর।
জিনিয়া ঘরে ঢুকে মুনীরাকে সালাম করতে যাচ্ছিল। মুনীরা ওকে জাপটে বুকে চেপে ধরে বলল, ওরে বাসরে, ওসব করতে হবে না ভাই। আমি তো ভাবী, আমাকে ওসব করতে হবে কেন? তারচে এসো হাতে হাতে মুসাফাহ করি। ভাবী ননদে সেইটেই মানাবে ভাল। বলেই জিনিয়ার একখানি হাত নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে মুনীরা মৃদু চাপ দিল।

তারপর পৌঢ় ভদ্রলোককে বলল, চাচাজান আপনি পাশের ঘরে যান ওখানেই আপনার ছেলে আছেন।

ভদ্রলোক ‘তাই যাই মা’ বলে মাহতাবের ঘরের দিকে চলে গেলেন।

জিনিয়া বলল আপনার হাতখানা দারুন নরম, ভাবী! মনে হচ্ছে যেন নরম তুলো।

- ভাবীকে কি কেউ আপনি আপনি করে? তোমাকে ভাই আমি আপনি বলতে পারব না। একেবারে সোজাসুজি তুমি। আর তুমিও আমাকে তুমি বলবে।

জিনিয়া অবাক হয়ে বলল, চমৎকার মানুষ তো ভাবী। একেবারে এক মিনিটের মধ্যে।

মুনীরা বাধা দিয়ে বলল, মনের মিল হলে তো তাই হয়। এসো বলে ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে পাশের রুমে ঢুকল।

জিনিয়াকে চেয়ারে বসতে দিয়ে বলল, সব খবর ভাল তো, ভাই?

জিনিয়া ঘরের ভিতরে চারদিকে দেখতে দেখতে বলল,ভাল।

মুনীরা বলল, চল, নাশতা খাবে, চল।

- এখন কিছু খাব না, ভাবী। এই সাত সকালে আমার খিদেই হয় নি।

- তবে চল চাচাজানের জন্যে নাশতা পাঠিয়ে দেই।

জিনিয়াকে পেয়ে মুনীরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। ঢাকায় এসে অবধি এরকম কোন আত্মীয় স্বজন ওদের বাসায় আসেনি। ভাই-ভাবী তো নিজের সংসার ছেড়ে নড়া চড়া করতেই পারেন না। আর তো কেউ নেই। কে আসবে ? জিনিয়াকে মুনীরা আগে কখনো দেখেনি। ওকে কাছে পেয়ে মনে হচ্ছে মেয়েটি যেন ওর কত আপন।


কিচেনে ঢুকে জিনিয়াকে বলল, তুমি বসো, ভাই। আমি চাচাজানকে গোটা কয় লুচি ভেজে দিই। হালুয়া করাই আছে। লুচি ভাজতে দেরী হবে না।

জিনিয়া বলল বাবা তো হালুয়া খান না, ভাবী! বাবার যে ডয়াবেটিস। মিষ্টি খাওয়ার জো নেই।

- তা হলে? মুনীরা চিন্তিত হয়ে উঠল।

- অত ভাবতে হবে না তোমাকে। বাবার এখনো খিদেই পায়নি। খাওয়ার ব্যাপারে অত তাড়াহুড়া করার দরকার নেই।

- না ভাই তোমরা সেই কখন খেয়ে বেরিয়েছ তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। খিদে নেই বললেই কি আমি শুনব? গেন্দা কোথায় রে? মুনীরা কাজের ছেলেটিকে ডাকতে লাগল।

একটি দশ বারো বছরের বেঁটে খাটো ছোকরা ভেজা হাতে সামনে এসে বলল, কী কইতাছেন আপামনি?

- কী করছিস রে?

- বাসন ধুইবার লাগছি। গেন্দা জবাব দিল।

- বাসন ধোয়া রাখ, তুই এক কাজ করতে পারিস ভাই? দৌড়ে গিয়ে বাজার থেকে সের দুই গোস্ত আনতে পরিস?

- খাসির না গরুর?

- খাসির।

- হ, পারুম।

- দেখে শুনে আনিস, তোর দাদার পরিচিত কসাই আছে না? নছর কসাই। ওকে বলিস, বিবি সায়েব পাঠিয়েছে। ভাল দেখে যেন দেয়।

- আইচ্ছা ট্যাহা দেন।

মুনীরা বালিশের তলা থেকে কয়েকটি নোট বার করে ওর হাতে দিয়ে বলল, যাবি আর আসবি, ভাই। দেরি করিস নে যেন।
ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে গেন্দা বাজারের থলেটা নিয়ে ছুট দিল।

ফিরে এসে মুনীরা জিনিয়াকে বলল, তবে লুচি থাক, পরোটাই বানাই। চাচাজান তো চা খান?

- খান, স্যাকারিন দিয়ে।

- ওই যা, গেন্দা যে চলে গেল। বাজার থেকে স্যাকারিন আনানোর কথা বলা যেত। আচ্ছা ও আসুক। আবার পাঠালেই হবে।

- বলেই মিটসেফ থেকে ময়দা ঘি বার করে খাবার তৈরীর জন্যে সে বসে গেল। জিনিয়াও ওর কাছে একটা পিড়িতে বসল।
মুনীরা বলল কোচে তো তোমার সারারাত ঘুম হয়নি। আমার হাতের কাজ শেষ হতে হতে তুমি না হয় একটু চোখ বুজে বিশ্রাম করে নাও।

- কোচে আমার অসুবিধা হয়নি, ভাবী। জানালার ধারে বসেছিলাম তো। ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাসে ঘুম হয়েছে ভালোই।

- চলন্ত গাড়িতে তুমি তাহলে ঘুমোতে পারো দেখছি? গাড়িতে চড়লে আমার কিছুতেই ঘুম আসে না।

জিনিয়া হেসে বলল, আমার আবার মনে হয় নাগর দোলায় চেপেছি। বাবা পাশে বসে। আমার আর ভাবনা কি? বলেই সে মুনীরার মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত একাগ্র হয়ে তাকিয়ে রইল।

মুনীরাকে নিবিড় ভাবে দেখে নিয়ে জিনিয়া বলল, দারুণ অবাক হয়ে গেলাম ভাবী!

মুনিরা ময়দায় ময়ান দিয়ে একটু পানি দিতে যাচ্ছিল থমকে থেমে জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল অবাক কেন?

- মনে হচ্ছে , তুমি কত কালের যে চেনা মানুষ ।

- তাই?

- জিনিয়া মৃদু হেসে বলল মানুষকে এমন অবাক করে দিতে পারো ভেবে আশ্চার্য হই?

- তুমি যে আমার ননদ, ভাই! চেনা শোনা না থাকলেও তো চেনা শোনা হতে দেরি হবার কথা নয়।

- সত্যি বলতে কি মনে মনে তোমার ওপর আমার দারুণ একটা রাগ ছিল ভাবী। সেটা আজ ধূয়ে মুছে গেল।

মুনিরা অবাক দৃষ্টিতে জিনিয়ার দিকে তাকাল। বলল আমার ওপর রাগ? কেন? আমাকে তো তুমি চিনতেই না কখনো।রাগ হবে কী করে?

- চিনতাম না? তোমাকে তো আমি ভাল করেই চিনতাম ভাবী! তুমি আমার কথা কোন দিন তাহলে শোন নি? মাতু ভাই বলেনি তোমাকে?

- মুনিরা সামলে নিয়ে বলল বললেও কি দেখা শোনা না থাকলে মনে রাখা যায়? এবার দেখো ঠিকই মনে থাকবে।

জিনিয়া বলে যেতে লাগল, মাতু ভাই আমার বাবার খুব প্রিয় ছাত্র ছিল। বাবা ওকে খুবই ভালবাসতেন। বিয়ের সময় মাতু ভাই বাবাকে একটা সংবাদও দেয় নি। মাতু ভাই সত্যি একটা সেলফিস।

মুনীরা সায় দিয়ে বলল, ও একটু আছে ঐ রকম।

- একটু নয় , একটু নয়, - সাংঘাতিক। তুমি শুনে আশ্চর্য হবে, বাবাকে মাতু ভাই নিজেই পাক্কা কথা দিয়েছিল। বলেছিল, ব জিনিয়াকে আমি বিয়ে করব। পাশটা হলেই হয়। ওমা পাশ হবার পরদিন শোনা গেল কি, ভদ্রলোক চুপে চুপে বিয়েরকম্ম সেরে ফেলেছে। বলেই জিনিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল।

মুনীরার হাতটা একটু কেঁপে গিয়েছিল। মূহুর্তে সামলে নিয়ে হেসে উঠে বলল, লোকটা স্বার্থপর বটে কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে স্বার্থপর হতে গিয়ে শেষে বড্ডো ঠক খেয়েছে।

জিনিয়ার হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরে এসেছে। প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, না ঠকেনি, ঠকেনি। জিতেছে, দারুন জিতেছে। তোমাকে না দেখলে সেটা আমার বিশ্বাসই হত না, ভাবী!

ওর আলাপের মাঝখানে পাশের কামরা থেকে জিনিয়ার বাবা আসলাম সাহেবের কন্ঠস্বর শোনা গেল। জিনি ওরে ও জিনি!

জিনিয়া পিঁড়ীর ওপর থেকে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এই সেরেছে রে, বাবা ডাকছে। এখন কি করি?

- কেন, ডাকছেন কেন?

- বোধ হয় মাতু ভাইয়ের সাথে দেখা করতে।

মুনীরা আপত্তি করে বলল, তা বলবেন কেন? চাচাজান পরহেজগার মানুষ। তুমি বড় সড় হয়েছ। ওখানে তোমাকে যেতে বলবেন কেন? হাজার হলেও সে তোমার আপন ভাই তো নয়।

- ছোটবেলা থেকেই তো মাতু ভাইয়ের সামনে মানুষ হয়েছি। আগে সব সময় সামনে যেতাম। মাতু ভাইয়ের বিয়ের পর কেমন লজ্জা লজ্জা করছে। আর বাবার কথা বলছ? বাবা পরহেজগার হলেও খুব মডার্ণ। কনজারর্ভেটিভ নয়। আমি তো নাচ গান সবই জানি। এই সেদিনও কলেজে ড্রামা করে এলাম।

- চাচাজান করতে দিলেন?

- হ্যাঁ তিনিই তো আগ্রহ করে....... কিন্তু এখন কি করি ভাবী? মাতু ভাইয়ের সামনে যেতে যে দারুণ লজ্জা করছে?

মুনীরা হেসে উঠে বলল, স্টেজে উঠার আগেই যা কিছু লজ্জা। একবার উঠলেই লজ্জা তোমার ভেঙ্গে যাবে। তুমি তো ভালই জানো।

- যাব তাহলে?

- যাবে ,যাও।

- ড্রেসিং টেবিলে গিয়ে মুখটা একটু দেখে নেই, ভাবী।

- আসলাম সাহেব আবার হাঁক দিলেন, জিনিয়া গো!

- যাই বাবা! ভাবী তুমি এস!

ময়দা হাতেই মুনীরা উঠে দাঁড়াল। বলল, চলো।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার যা যা লাগবে সবই এখানে পাবে। দরকার মত নিও। বলে মুনীরা কিচেনে চলে গেল।

জিনিয়ার কপালের চুলগুলি একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল, চিরুনী বুলিয়ে ঠিক করে নিল। রাত্রির ধকলে ঠৌঁটের রংটাও চটে গিয়েছিল। মুনীরার গোলাপী লিপস্টিকের ডগাটা একটু ঠোঁটের উপর বুলিয়ে, চোখের কাজলটা দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে মাহতাবের ঘরের দিকে চলে গেল।

ওকে ঘরে ঢুকতে দেখে আসলাম সাহেব বললেন, আয় মা আয়। বলেই চোখের ইশারায় মাহতাবের পা দুটোর দিকে ইঙ্গিত দিলেন।

জিনিয়া ঘরে ঢুকে মাহতাবকে কদমবুঁচি করতে গেল। মাহতাব ধরমড়িয়ে উঠে বলল, এই রে, আমার পায়ে আবার এসব করা কেন? আচ্ছা পাগল তো!

আসলাম সাহেব সফেদ দাড়িতে হাত বুলিয়ে কৃতার্থের হাসি হেসে বললেন, তুমি তো ওর বড় ভাই এর মতন বাবা! একটু পায়ে হাত দেব না তো কি? মুসলমানদের একটা এটিকেট আছে না? বলেই ঠোঁটের উপর আলতো হাসির রেখা ফুটিয়ে বলতে লাগলেন, একলাই আমি আসছিলাম বাবা। ভাবলাম জটিলতা যখন সৃষ্টি হয়েছে তখন মাতুর কাছেই যাই। এডুকেশন অফিসারটা তোমার গে দারুন খচ্চড়। অডিটের ব্যাপারটা নিয়ে ভয়ানক ভ্যানতাড়া করছে। বেরোতে যাব, জিনিটা পিছু লাগল। বলল ঢাকায় যখন যাচ্ছ বাবা, উঠবে তো মাতু ভাইয়ের বাসায়। ভাবীকে কোন দিন দেখিনি। আমিও যাব তোমার সাথে। বললাম, যাবি চল। মাতু তোর ভাই। অসুবিধার কি আছে? তাছাড়া তোর এডমিশনের খোঁজ খবরটাও নিতে পারবি। চল।


মাহতাব হেসে বলল, ভালই করেছেন ওকে সঙ্গে এনে। তোমার এবার কোন এয়ার হল যেন?

আসলাম সাহেব মাঝখানে বলে উঠলেন, মাতু তো জিনিকে আগে ‘তুই তুই’ করত মনে হয়?

জিনিয়া ঘাড় নেড়ে সাপোর্ট করে বলল, হ্যাঁ বাবা, বিয়ের পর মাতু ভাই এখন অনেক বদলে গেছে।

মাহতাব বলল, আরে তা নয় তা নয়। মানুষ বয়সে বড় হয়ে গেলে সম্বোধনটাও তো বদলাতে হয়। জিনিয়া ঠোঁট উল্টে বলল, ইস, আজ একটা নতুন কথা মাতু ভাইয়ের কাছে শোনা গেল। পৃথিবীতে বোধকরি আজ এই জিনিসটি চালু হল।

মাহতাব এবার আড় চোখে জিনিয়ার দিকে তাকাল। উনিশ বিশ বছরের মেয়েটিকে খুব যে সুন্দরী বলা যায় তা নয়। কিন্তু কেমন করে সুন্দরী হয়ে উঠতে হয় সেটে সে ভালভাবেই রপ্ত করেছে। ওর আড় চোখের দৃষ্টিটা আসলাম সাহেবেরও চোখ এড়াল না। তিনি লক্ষ্য করে ভেতরে ভেতরে ভীষণ খুশী হয়ে আর একবার দাঁড়ির মধ্যে আঙ্গুল ঢুকালেন।


এবার মাহতাব ‘তুই তুমি’ সবটাই ভুলে গেল। বলল, কোন ইয়ার হলো?

আসলাম সাহেব জিনিয়ার হয়ে জবাব দিলেন, ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করেছে। আমি ওকে বললাম লোকাল কলেজেই ভর্তি করে দেই। কিন্তু ওর ইচ্ছে সোসিউলজিতে অনার্স পড়বে। রাজশাহিতে দেয়া যেত। কিন্তু শহরটা নিকটে হলেও আসলে সেখানে তো ওর নিজের বলতে কেউ নেই। আজকাল যা দিনকাল পড়েছে। বুঝলে না, বাবা!


জিনিয়া বলল, এখানকা ভার্সিটিতে বোধকরি চান্স পাব ন। এখানে তো শুনি ফাস্ট ডিভিশন ওয়ালারই কমপিটিশন করে কুলাতে পারে না। কোথায় যেন একটা মহিলা কলেজ আছে? সেখানে অনার্স আছে নাকি?

- অনার্স আছে কি না দেখি নিই। আজকেই জানা যাবে।

আসলাম সাহেব অনেকটা কাকুতির ভঙ্গিমায় বললেন, তাই দেখ বাবা। তুমি আমার হাতে গড়া ছেলে। মেয়েটার একটা হিল্লে তোমাকে করতেই হবে। ওর এই আশাটুকু তোমাকে পুরণ করতেই হবে, বাবা।

- ঠিক আছে দেখি। বলেই আবার সে জিনিয়ার মুখের দিকে মুখ ফেরাল।

জিনিয়া তখন আড় চোখে দুষ্টুমির হাসি হাসছে। মাহতাব তার শিক্ষকের সামনে লজ্জা পেয়ে ভয়ে দৃষ্টিটা নামিয়ে নিয়ে পড়ে থাকা একটা পত্রিকার বড় বড় অক্ষরে লেখা নামটির ওপরেই বার বার চোখ বুলাতে লাগল।

মুহুর্তখানিক পর কাগজ থেকে মুখ তুলে মাহতাব বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। ওর ভর্তির ব্যাপারে আপনি চিন্তিত হবেন না। আমি দেখছি । কিছু একটা করা যাবে আশা করি।

আসলাম সাহেব জিনিয়াকে বললেন, তা’হলে তুই যা মা তোর ভাবীর কাছে। মাহতাব যখন ভার নিয়েছে, তোর ভর্তির হিল্লে একটা হবেই। আর চিন্তা কি?

জিনিয়া হাসতে হাসতে অন্যঘরে চলে গেলে আসলাম সাহেব মুচকি হেসে বললেন, জিনিটা বড্ড যেদি! পাগলীটা যখন শুনল তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। তখন জিদ করে বলল, আমি মাতু ভাই এর মতনই লেখা পড়া শিখব। দেখ তো বাপু, কেমন পাগলী! তুমি ছিলে স্কলার বয়। লাখে একটা এমন ছেলে পাওয়া যায় না। তোমার সাথে পাগলীটা চায় কম্পিটিশন করতে। তা কি আর সম্ভব? তবে এটা ঠিক যে সে অনেক মেকআপ করেছে বলতে হবে। জিদ না করলে সে সেকেন্ড ডিভিশনও পেত না। আরো জিদ করে সে কি করেছে জানো? ফণী মাস্টারের কাছে দিনরাত লেগে থেকে গানও শিখে নিয়েছে। নজরুল গীতিটা সে যা গায় না? সবাই অবাক হয়ে শোনে। একদিন তুমিও শুনে দেখো। তোমারও খুব ভাল লাগবে।


মাহতাব আসলাম সাহেবের হাসিমাখা মুখখানির দিকে তাকিয়ে দেখল, চকচকে কপালের মাঝখানে একটা সিজদার চিহ্ন তামাটে বর্ণ ধারণ করে রয়েছে। বলল, ভালই করেছে। জীবনে ও শাইন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

আসলাম সাহেব খুশির চোটে বলতে লাগলেন, শুধু তাই না বাবা ও তোমার চমৎকার নাচতেও শিখেছে। ফণী বাবু তো ড্যান্সেরও মাষ্টার কিনা। বলল, ওটা আবার বাদ থাকে কেন? বললাম দাওনা শিখিয়ে দাদা! ঢাকায় তো থাকছে মেয়েটা । কোন ফাংশান টাংশান হলে ওকে নাচতে বোলো। দেখো ও তোমাকে নিশ্চই খুশী করতে পারবে। আচ্ছা আমাদের বৌ কেমন হয়েছে? গানটান একটু আধটু............


- না না ওসব কিছু সে জানে না। মাহতাব তড়িঘড়ি জবাব দিল।

আসলাম সাহেব হেসে উঠে বললেন, সে তো আমি আগেই জানতাম রে বাবা! মুকাররম সাহেবের ফ্যামিলিটা খুব আউট ডেটেড। তুমি নাকি পছন্দ করে বিয়ে করেছ শুনলাম?

মাহতাব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে হ্যাঁ না করে বলল, ঠিক তা নয়।আমার এক বন্ধু জোর করে........

- না বাবা, সবসময় বন্ধুর কথার ওপর ব্লাইন্ডলি ডিপেন্ড করেত নেই। তবে মনে হল মেয়েটি বেশ ভালই। এক ঝলক দেখলাম, তাতেই বুঝলাম ওকে গড়ে নিলে তোমার ভালই হবে!

মাহতাব বলল, ভিন্ন একটা দৃষ্টিভঙ্গিতে কেউ যদি গড়ে উঠে তাকে আর ভেঙ্গে গড়ে যায় না, স্যার।

আসলাম সাহেব কথাটি সমর্থন করে বার বার মাথা দুলিয়ে বলতে লাগলেন, তা ঠিক বলেছ বাবা, তা ঠিক।

গরম ঘিয়ের উপর পরোটা ভাজার চড় চড় করে একটা শব্দ উঠছে। মুনীর খুন্তির ফলা দিয়ে পরোটাখানি একবার উল্টে দিয়ে তাকিয়ে দেখল জিনিয়া হাসি মুখে ফিরে আসছে। ওকে বসতে ইঙ্গিত করে বলল, কি, লজ্জা ভাঙ্গল বুবুজানের?

- আমার শুধু একার লজ্জা নাকি? তোমার সেই পতি পরম গুরুও লজ্জায় মরে যাচ্ছ, দেখ গে। দেখলাম, আমাকে আগে তুই তুকারি করত। এখন আবার নতুন করে তুমি তুমি শুরু করেছে। ওমা, আমি হাসতে হাসতে মরেই গেছি। হি হি হি হি।

মুনীরা খুন্তির ডগায় পরোটাটি আবার উল্টে দিয়ে বলল, লজ্জা তো মেয়েদের ভূষণ ভাই। মেয়ে কুলে আল্লাহ তোমাকে জন্ম দিয়েছেন, তোমার লজ্জা থাকবে না এটা তো হয় না।

ধারণাটাই তোমার সেকেলে হয়ে গেছে ভাবী। আজকাল প্রগতির যুগে ওসব কেউ কি মানতে পারছে? জীবনটা এখন সত্যি সত্যি বড্ডো জটিল।

মুনীরা হেসে উঠে বলল, যাই বলো ভাই, ওসব প্রগতি আবার অনেক সময় দুর্গতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়! প্রগতীর নামে সীমা লঙ্ঘন কিন্তু ভাল নয়।

জিনিয়া বলল, তাহলেই মরেছ। তোমার যা মনোভাব, ওটা এখন চালু রেখে পুরুষকে তুমি বশে রাখতে পারবে? আমি আগে সেটা বুঝিনি বলেই তো তোমার কাছে হেরে গেছি। তাই তো আমার আকাশ মেঘলা আর তোমার আকাশ রাঙা।

- আগে তো জানতে পারিনি, ভাই। জানলে তোমার আকাশটা কি মেঘলা হতে দিই? খুব কষ্ট দিয়েছি।

- কষ্ট নয়, কষ্ট নয়, ভাবী। তোমার মতন একজন ভাবী পাওয়াও তো কম ভাগ্যের কথা নয়। ঢল ঢল সোনার মেয়ে, অঙ্গ ভরা রূপ কেন তুমি বোকা সেজে খোঁজ অন্ধ কুপ। কী মিষ্টি আর স্নিগ্ধ তোমার চেহারা! তবে ভারী বোকা মেয়ে তুমি। চোখে তোমার কাজল নেই, ঠোঁটে রঙ নেই, কপালে টিপ লাগাও না, নখে নখ-পালিশ দাও নি। বল, তুমি বোকা মেয়ে কি না!

মুনীরা হাসি মুখে বলল, ঠিকই ধরেছ তুমি। আমি একটা আস্ত বোকা!

জিনিয়া বলল, অমন ধারা হলে কিন্তু চলবে না। তোমাকেও কম্পিটিশন চালাতে হবে।

- কার সাথে কম্পিটিশন চালাব?

- সবার সাথেই। আমার ঢাকায় থাকার চেষ্টা হচ্ছে। যদি এডমিশনের সুযোগটা হয়ে যায়, তখন আমার সাথেও, বুঝেছ সুন্দরী?

- আমার তো গায়ে অত জোর নেই। যুগের সাথে দৌড়ে আমি তো কুলোতে পারবনা। নির্ঘাৎ ফেল হয়ে যাব যে।

মুনীরা রিত্রিবেলা জিনিয়াকে কাছে নিয়ে শোবার আয়োজন করল। হাজার হোক স্বামির গুরুকন্যা। একটু আদর আপ্যায়ন না করলে কি মনে করবে?

জিনিয়া ওর দিকে কাৎ হয়ে শুয়ে বলল, এবার তোমার প্রেমে পড়ার কাহিনীটি শোনাও তো ভাবী৷

মুনীরা হেসে বলল, প্রেমে কি আমি পড়েছি যে তোমাকে তার কাহিনী শোনাবো?

- তবে? মাতু ভাই একা একাই পড়েছিল তাহলে?

- তাও জানিনা৷

- জানোনা মানে? এত দিন বিয়ে হয়ে গেল, একবার জিজ্ঞাসাও করোনি?

মুনীরা হেসে উঠল৷ বলল, বিয়েটাই তো সমস্ত- জিজ্ঞাসার শেষ ৷ জবাই করা হয়ে গেলে, কোন ছুরিতে তা হল তা আর কে জিজ্ঞেস করতে যায়, বল ৷

- কিন্তু শুনেছিলাম মাতু ভাই এর সাথে তোমার নাকি লাভ হয়েছিল ৷ আমরা তাই জানি৷ আমরা কেন, দেশশুদ্ধ সবাই তাইই জানে৷

- বিয়ের আগে তো দূরের কথা বিয়ের পরে ও তোমার ভাই বলেন, লাভ টাভ কী জিনিস আমি নাকি আদতেই বুঝিনা৷

জিনিয়া নাটুকে ঢঙ্গে বলল, সত্যি? তুমি শহুরে মেয়ে হয়েও অমন সরল সোজা মানুষ সেটা না দেখলে সত্যি বিশ্বাস হত না৷ কিন্তু শহরে থেকে ঐ অভ্যাসটা রপ্ত করলে কেমন করে? ওটা তো কম কঠিন জিনিস নয়, ভাবী !

মুনীরা বলল, সব কথা শুনলে তোমার আবার হাসি পায় কিনা কে জানে৷ যুগের দাবি বলতে যা এখন মানুষ বলে, আমাদের বাড়ির ত্রিসিমানায় কোন দিনই তার প্রশ্রয় নেই৷ তুমি জানো কিনা জানি না, আমার ভাইজান একজন জাঁদরেল ইঞ্জিনিয়ার৷ তাঁর চেয়ে অনেক ছোটখাটো ইঞ্জিনিয়াররা বাঁহাতের রোজগারে কোটিপতি হয়ে গেছে৷ কিন্তু ভাইজান বাঁহাতের রোজগারকে নর্দমার দুর্গন্ধ ময়লার মতন ঘৃণা করেন৷ আমাদের বাড়ির পরিবেশটাই ঐ রকম৷

- তোমার ভাইজান সত্যি ভাল মানূষ৷ কিন্তু ভাল মানুষ দিয়ে আজকের দিনে কোন কাজ হয় না৷ আমাদের ইউনিয়নে তোমার ভাইজানের মতন একজন সৎ লোক ইলেকশানে দাঁড়িয়ে ছিল৷ লোকে বলল, উনি চেয়ারম্যান হল উপরওয়ালাদের ঘুষও দিতে পারবেন না, উন্নয়নের কাজে স্যাংশনও পাবেন না। লোকে তাকে শেষতক ভোটই দিল না৷ লোকটা পাশ করবে কি? ভাল
লোক আজকাল কোন কাজই করতে পারে না ৷

-সেই জন্যেই তো মন্দ লোকের দৌরাত্ন্য বেড়ে যাচ্ছে! মন্দ উপায়ে উন্নয়নের জন্যে টাকা আনবে আশা করে যারা ভোট দেয়, তাদের কপালে কোন দিন মন্দ ছাড়া ভাল কিছু জোটে না৷

জিনিয়া হঠাৎ বলে উঠল, মন্দ অমন্দের কথা ছাড়ো৷ এ বিতর্কের শেষ নেই৷ তুমি একটা কথার জবাব দাও ৷ আচ্ছা, মাতু ভাই তোমাকে কেমন ভালবাসে, বলত৷

মনীরার বুকটা ধাড়াস করে উঠল৷ সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, খু-উ-ব ৷

জিনিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সংক্ষিপ্ত একটি শব্দ উচ্চরণ করল, বেশ ৷

ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে, মুনীরা জিনিয়াকে ডাকল৷ জিনিয়া বলল যে, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলে তার শরীর খারাপ করে ৷ শেষে মুনীরা একলাই উঠে অযু নামায সেরে গেন্দাকে ডাকতে গেল৷

গেন্দা চোখ মুছতে মুছতে বলল, কি কইত্যাছেন, আপামনি?

- তোর দাদাকে ডাক তো গেন্দু!

- যাইত্যাছি৷ বলে গেন্দা মাহতাবের ঘরে গিয়ে ঢুকল৷ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, দাদা অহনু ঘুমাইত্যাছেন৷ ডাকতাম?

গেন্দার ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠে মাহতাব চোখ মুছতে মুছতে এসে বলল, ডাকছ?

- হ্যাঁ, তুমি আজ নিজে একটু বাজারে যেতে পারবে?

- কী দরকার? গেন্দাই তো পারত৷

- বাসায় মেহমান এসেছেন৷ তুমি নিজের থেকে একটু দেখে শুনে বাজারটা করে দিলে খুব ভাল হত ৷

- হুকুম হলে যেতেই হবে৷

মুনীরা হেসে বলল, বাসায় ননদ এসেছে। একটু ভাল আপায়ন না করলে দুর্ণাম হবে যে ৷

- মেয়ে মানুষকে অত বেশি লাই দিও না বুঝেছো? ছুড়িটা দারূন মাথায় উঠতে জানে।

- ছিঃ তোমার মুখটা একেবারে লাগাম ছাড়া৷ চাষাভুষোর মতন৷

- মাহতাব বলল, স্যার এসেছেন, তুমি তো দেখা করলে না৷ উনি বলবেন মাহতাবের বৌটা কুনো, দেখাই করল না ৷ তোমার দুর্ণাম হবে না?

মুনীরা মুহুর্ত কাল চিন্তা করে বলল, তা হোক, তুমি তো জানো, আমি অন্যমানুষের সামনে দাঁড়াতেই পারি না৷ আমার ভীষণ লজ্জা করে ৷

- স্যার কি অন্য মানুষ হলেন?

- হ্যাঁ গো হ্যাঁ, তুমি ছাড়া এখানে সব মানুষই আমার কাছে অন্য মানুষ ৷ নিন্দে হয় হোক ৷ আল্লাকে রাগানোর পরিবর্তে মানুষকে রাগানো ঢের ভাল৷

মাহতাব বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার সেকেলেপনা আর গেল না৷ কথায় কথায় আল্লাহকে টেনে আনা তোমার চিরকালের একটা মুদ্রাদোষ৷ আমি আর পারি না, কইরে গেন্দা! বাজারে থলে নে, চল৷

বাইরে কিছু দূরে গিয়ে ফিরে এসে বলল, স্যার তো কালই চলে যাবেন, জিনি থাকবে নাকি শুনছি৷

- আমাদের এখানে?

- তা হ'লে কেমন হয়?

- ভালই তো হয়৷

- আমার মনে হয় সেটা খুব ভাল হবে না ,ওকে হোস্টেলে রাখাই ঠিক হবে ৷

- চাচাজান কী মনে করবেন?

- মনে তো অনেক কিছুই করতে পারেন৷ এখানে ও থাকলে আমাদের প্রাইভেসীর অসুবিধা হবে না?

- কী এমন অসুবিধা হবে ? ও থাকবে ওর পড়াশুনা নিয়ে ৷ দেখো তোমার সামনেও সে যেতে পারবে না৷

- না, না, ঝামেলা হবে ৷ তুমি এখন বুঝতে পারছ না ৷

- তবে যা ভাল হয় করো ৷


পরদিন শহরের একটি কলেজে জিনিয়া ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল৷ মাহতাবের একজন কলীগের বোন ঐ কলেজটির আধ্যাপিকা৷ আজকাল জানা শোনা থাকলে ভর্তির ঝুঁকি ঝামেলা কমে ৷ জানাশুনা না থাকলে ঘুরতে ঘুরতে জুতোর তলাটা ক্ষয়ে যায় ৷


কলেজের সাথেই হোস্টেল৷ সেখানেই ওর থাকার বন্দোবস্ত হয়ে গেল৷
এত সহজে যে সব কিছু ব্যাবস্থা হয়ে যাবে জিনিয়া প্রথম প্রথম তা ভাবতেই পারেনি ৷ পরদিন দুপুরের দিকে আসলাম সাহেবের ফেরবার কথা৷ ষ্কুলের হিসেব পত্র নিয়ে একটা ঝামেলা বেধেছিল ৷ বছর সাতেকের মধ্যে ষ্কুল ফাণ্ডের কোন অডিট হয়নি ৷ আগে যে সমস্ত- এডুকেশন অফিসার আসতেন, আসলাম সাহেব তাদের এনিহাউ ম্যানেজ করে নিতেন৷ নতুন এডুকেশন অফিসারটি নাকি ভারি পাজি ৷ তাকে ম্যানেজ করাই যাচ্ছে না ৷ ইসলামপুর হাই ষ্কুলের হেডমাস্টারের নাকি জেল টেলও হয়ে যেতে পারে ৷
ইসলামপুর হাইষ্কুলের চেয়ে তাঁর ষ্কুলের একাউন্টের অবস্থাটা বেশি খারাপ ৷ ষ্কুলে দশজন টীচার, ওদিকে পনের জনের ইনক্রিজড স্যালারী ড্র করা হচ্ছে আজ কয় বছর ধরে ৷ ডেভেলপমেন্টের টাকার একটা উল্লেখযোগ্য পরিমান ভাউচার করিম এণ্ড কোং একসেপ্টেবল মনে করেনি ৷


এই সময় থানা হেডকোয়াটারে বাড়িটা তৈরী করেও আসলাম সাহেব একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছেন৷ শিক্ষকদেরও কেউ কেউ নেপথ্যে বাড়িটা নিয়ে কানা ঘুষা করছে ৷ ওরা তো ওরকম করবেই তাদের করার কিছুই থাকতো না যদি ঐ এডুকেশন অফিসার ব্যাটা ত্যাড়া না হত৷ চোখে প্রায় অন্ধকার দেখছিলেন আসলাম সাহেব মাহতাবের কথাও তার মনে হয়েছে বার বার৷ কিন্তু মাহতাবের ওপর তিনি তখন মনে ভীষণ চটে ছিলেন৷ মাহতাব যখন ম্যাট্রিকে স্ট্যাণ্ড করে বেরিয়ে যায় তখন থেকেই তাঁর লোলুপ দৃষ্টি ছিল ছেলেটির ওপর৷ মাহতাবকে হেডমাস্টার সাহেব করূণাও করেছেন৷ অন্যান্য ষ্কলারশিপ হোল্ডারদের স্টাইপেণ্ডের টাকা নিয়ে হেংকি টেংকি করলেও, মাহাবেরটা নিয়ে কখনো সেরকম কিছু করেননি৷ ছেলেটি বিয়ের ব্যাপারে রাজীও হয়েছিল৷ কিন্তু শহরে আসতেই শহুরে চিড়িয়া ওর দেমাগ দিল বিগড়ে ৷ মাহতাবের ওপর তাই রাগ ছিল খুব ৷ শেষতক সেই রাগ ঝাল ভুলে ওর কাছেই আসতে হল আসলাম সাহেবকে ৷ তবে হ্যাঁ, খুশী করেছে তাঁকে মাহতাব ৷ সবদিক দিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে এখন তিনি ফিরতে পারছেন ৷ অডিট কোম্পানীর ওপর ওর হাত আছে ৷ সেটা সে আসলাম সাহেবের জন্যে কাজে লাগানোর প্রতিশ্রূতি দেয়েছে ৷ আর জিনিয়ার ভর্তিটা? খুব খুশী মনে সফেদ দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে পরিতৃপ্ত হয়েই আসলাম সাহেব বাড়ি ফিরলেন ৷


সেদিন জিনিয়াকে হোস্টেলে রেখে ফিরে আসতে গেলে জিনিয়া বলল, মাতু ভাই, শুনুন!

- কিরে? মাহতাব ফিরে দাঁড়াল ৷

- আপনি শিগগীর আসবেন তো?

- আসব না মানে? তুই অত ভাবছিস কেন? তোকে ভরতি করে দিলাম আর ভেবেছিস আমি কোন খোঁজ খবরই নেব না? পাগলী কোথাকার ! আমি খুব ঘন ঘন আসব দেখিস ৷

- না এলে আমার খুব খারাপ লাগবে কিন্তু ৷

- খারাপ লাগতে না দিলেইতো হল? বলে মাহতাব ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল জিনিয়ার চোখে একটা অদ্ভুত আকর্ষণীয় দৃষ্টি ঝরে পড়ছে ৷ মুনীরা ওর চেয়ে অনেক সন্দুরী বটে কিন্তু ওর দৃষ্টিতে জিনিয়ার মতন আর্ট নেই ৷ জিনিয়া সত্যি নিজেকে রূপসী বানিয়েছে ৷ চোখের বিদ্যুত দিয়ে কি করে পুরুষদের ঝলসে দিতে হয় তা সে ভাল করেই রপ্ত করেছে ৷ কয়েক মুহুর্ত অবাক হয়ে মাহতাব ওকে দেখতে লাগল ৷

জিনিয়া তেমনি রহস্যময় হাসি ঠোঁটে রেখে বলল, এবার আসার সময় ভাবীকে ও নিয়ে আসবেন৷

মাহতাব একটু বিরক্ত হয়ে উঠল, আরে তুই ভাবী ভাবী করিস কেন বলতো? ওর মধ্যে তুই এমন কী দেখেছিস?

মাহাতাবের রিক্তিতে জিনিয়া বরং খুশীই হয়ে উঠল ৷ বলল, ভাবীকে একটু টেনে বার না করলে শেষে আপনারই অসুবিধা হবে, মাতু ভাই ৷ একেবারে কুনো ব্যাঙ নিয়ে শেষে আপনিই হাঁপিয়ে উঠবেন দেখবেন ৷

- ওকে নিয়ে ঘর করা কি চাট্টিখানি কথা ভেবেছিস তুই? যা একটা চিজ না? সে আপন ভুবন নিয়ে আপনি বিভোর ৷ একটা ধমান্ধ মেয়ে মানুষ ৷ ওর ভাইটাও তাই ৷ আর সেই লোকটাকেই সে জীবনের আর্দশ বানিয়ে রেখেছে ৷

জিনিয়া হাসি মুখে বলল, ভাইকে তো আর চিরদিন পাওয়া যায় না ৷

যখন যার সাথে ঘর করতে হয়, মেয়ে মানুষকে যে তারই মনের মতন হয়ে উঠতে হয় ৷

- কিন্তু সে কথা ওকে বুঝাবে কে? তুই তো জানিস আমি হিসেব নিকেশের মানুষ হলেও মনটা আমার শিল্পীর?

- তা আবার আমি জানিনে? সেই যে ষ্কুলে আপনি সিরাজুদ্দৌলার রোল করেছিলেন? আমার মনে হত আমি আপনার সাথে আলেয়ার রোল করি ৷ আমার পোড়া কপাল, তা আর হল না এ জীবনে৷ আলেয়ার রোলটা করেছিল যে মেয়েটি, সে ছিল একেবারে আনাড়ি ৷

ওকে কেন এনেছিলেন ভাড়া করে?

জানেন মাতু ভাই, এবার আমি না কলেজে ড্রামা করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছি ।

মাহতাব খুশী হয়ে বলল, হ্যাঁ, সে তুই পারবি৷ সে কনফিডেন্স আমার আছে ৷

- আপনি ভাবীকে ...

বাধা দিয়ে মাহতাব বলল, তুই আমাকে আপনি আপনি করিস কেন রে?

আপন মানুষকে কি কেউ অমন আপনি আপনি করে বলে? তুমি তুমি করে বলতে পারিস না?

জিনিয়া খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, আচ্ছা এখন থেকে তাই হবে ৷

তুমি ...তুমি ... তুমি৷ হ'ল তো? এবার কী বলব তা যে ভুলেই গেলাম মাতু ভাই ৷

ওর হাসির ভাব -সাব দেখে মাহতাবের বুকের মধ্যে বিদ্যুতের একটা প্রবাহ বয়ে গেল ৷ বলল, এই মুখপুড়ি! হাসিস নি অমন করে ৷ হাসি তো নয় যেন আগুনের ঝলক ৷

জিনিয় খুব নরম আর মিষ্টি গলায় বলল, হাসিকে তোমার খুব ভয় করে, তাইনা মাতু ভাই ? অথচ একদিন তুমিই কেমন ভরাট গলায় বলেছিলে, আমার হাসি অমন সুন্দর করে কেউ হাসতে জানে না এখন তাহলে ভয় করছ কেন ?



মাহতাব বলল, সে তো নাটক রে ৷

- জীবনটাও তো একটা নাটক মাতু ভাই ৷

- তুই তাহলে স্বীকার করিস?

- সবাই স্বীকার করে ৷ তবে একজন হয়ত করে না ৷

- কে সে একজন ?

- আবার কে তোমার প্রিয়তমা বধু ।মুনীরা সুন্দরী৷

- তুই বড্ডো ফাজিল, জানিস? কথায় কথায় শুধু ওকে টেনে আনিস ৷

- ঠিক আছে ৷ আর টেনে আনবনা ৷ যাও ৷ তবে গিয়ে ভুলে যেও না যেন একেবারে ৷ তাহলে আমি কিন্তু মরেই যাব ৷

- মরে যাবার আগে একবার গান শুনাবি না জিনি ?

- জিনিয়া চমকে উঠে বলল, ওরে বাপরে! তোমাকে গান শোনাবো ? তাহলে আমাকে খুন করে ফেলবে না?

- কে খুন করবে তোকে ? আমার স্যার ?

জিনিয়া জিব কেটে বলল, না না ৷ তোমাকে গান শোনালে বাবা তো জেনে খুশীই হবে৷ ক্ষেপে যাবে তোমার বেগম সাহেব ৷ ভাববে...

- কী ভাববে?

- থাক সে কথা ৷ গান তুমি সত্যি শুনতে চাও?

- নিশ্চয় ৷ এর মধ্যে আবার মিথ্যে পেলি কোথায় ?

- কোথায় বসে শুনবে?

- কেন, আমাদের বাসায়?

- না মাতু ভাই, সেখানে হবে না ৷ অসুবিধা আছে ৷ তমি বরং অন্য একটা জায়গা ঠিক কর ৷ একটা গীতি সন্ধ্যাই তোমাকে আমি উপহার দেব। জায়গা ম্যানেজ করতে পারবে?

মাহতাব ভেবে চিন্তে - বলল, তা পারা যাবে ৷ তুই ঠিক ধরেছিস ৷ ও আবার গান টান পছন্দ করে না ৷ আমার এক বন্ধুর ওয়ইফ রেডিওতে প্রোগ্রাম করে ৷ থাকে রাংকিন স্ট্রীট ৷ ওখানেই হবে ৷ সাপ্তাহিক ছুটির দিন আসুক ৷



বাসায় ফিরে মাহতাব লক্ষ্য করল মুনীরা আজ স্বেচ্ছায় একটা অদ্ভুত কাজ করে বসেছে ৷ অনেক সাধ্য করেও মাহতাব ওকে যে শ্লীভলেস ব্লাউজ পরাতে পারেনি সেটা সে নিজেই গায়ে দিয়েছে ৷ চওড়া পেড়ে নীলাম্বরীটাও পাট ভেঙ্গে এই প্রথম পরেছে ৷ মাথায় ঘন কালো লম্বা চুলের বড় সড়ো একটা আলতো খোঁপা বেঁধেছে ৷ গলায় সরু মফচেন আর কানে ঝুল মুল তরুলতা দুল পরেছে ৷ খোঁপায় দিয়েছে আধ ফোটা দু'টি কণক চাঁপা ৷ চমত্কার লাগছে দেখতে !



ওকে দেখে মাহতাব বলল, কোথাও যাবে নাকি ?

মুনীরা হাসি মুখে বলল, চুল বাঁধলেও তোমার কেবল মনে হয় কোথাও যাব ৷ কিন্তু কেন গো? এসব কাকে দেখাতে বাইরে যাব? ভাবী বার বার বলেছেন,সাজগোজ করবি ঘরে ৷ বাইরে যাবার সময় খবরদার একটু সুগন্ধিও লাগাবে না শরীরে ৷ মেয়েদের সাজসজ্জা তো স্বামীর জন্যে ৷


- সেটা এক রকম মন্দ কথা নয়৷ কিন্তু এখন তো মেয়েরা সেজেগুজে বার হয়, আর ঘরে থাকে সাদা মাটা, দেখতে পাও না?

- কিন্তু মেয়েরা যদি জানতো তাদের ঐ সেজেগুজে বাইরে যাবার জন্যে সামাজটার কি রকম ক্ষতি হচ্ছে! শতকরা নব্বইটি দুর্ঘটনা যা আজকাল খবরের কাগজে দেখা যায় তা ঐ মেয়েদের রূপ- যৌবন প্রদর্শনীর কুফল, তা জানো?

- বেশ বেশ ৷ উলু বনে মুক্তো ছড়ানো তুমি বন্ধ করো ৷ দুটি চোখ বন্ধ করলেই ঝড় থেমে যায় না৷ তবে সেজেছ ভারি সুন্দর, মনে হচ্ছে এই প্রথম নতুন বৌ সাজলে ৷

মুনীরা বলল, ঐ যে তোমার লিবিয়ার দোস্ত? উনি চিঠি দিয়েছেন ৷

- কী লিখেছে ?

- আমি তো দেখিনি ৷ আমি কি তোমার চিঠি কখনো খুলি ? করুর চিঠি আমি খুলি না ৷

- ভাল করো৷ চিঠিটা আনো দেখি৷

খাম খুলে চিঠিটা পড়ে মাহতাব বলল, আটাশ তারিখ অর্থাৎ পরশু দিন রওশন আসছে৷ থাকবার জায়গাও ঠিক করেছ ৷ ওর বোনের বাড়িতেই উঠবে তা উঠুক ৷ কিন্তু ওকে তো রিসিব করতে যেতে হবে ৷ তুমিও যাবে তো? মুনীরা আপত্তি করে বলল, না গো না, আমি কাউকে রিসিভ-টিসিভ করতে পারবো না৷ ওটা তুমি একলাই করো৷


- তা না হয় নাই গেলে ৷ বাসায় এলে তো দেখা দেবে? না তখনও ঘোমটা টেনে বসে থাকবে? মুনীরা আমতা আমতা করে বলল, তা আসুক তো, তার পর দেখা যাবে৷

মাহতাব বলল, আমাদের বিয়ের জন্যে রওশন দারুন খেটেছে ৷ কিন্তু দুর্ভাগ্য, বিয়ের আগেই বেচারাকে চলে যেতে হল বিদেশে৷ তোমাকে একটিবারও সে দেখেনি ৷ তোমাকে দেখতে অবশ্যি চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোনাদিন সে তোমার দেখা পায়নি ৷

মুনীরা হেসে বলল, আমি যে কুনো ব্যাঙ ৷ ঘরের কোণা থেকে কোনদিন তো বাইরে যাইনি ৷ কাপড় শুকাতে গিয়ে তোমার চোখেই... সেই যে বলে কপালের লিখন ৷

মাহতাব প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, জিনিকে দিয়ে এলাম ভর্তি করে ৷

- ওর মন খারাপ করছে না তো?

- আরে ওর মন বড় শক্ত ৷ তোমার মতন নয় ৷ ও খুব চালু আছে ৷ তোমাকে যেতে বলেছে ৷ যাবে?

- যাওয়া তো দরকার ৷ ওকে ছুটির দিন এখানে চলে আসতে বললেই পারতে ৷

আগামী ছুটির দিন যে জিনিয়াকে নিয়ে মাহতাব রাংকিন ষ্ট্রীটে যাবে সে কথা ষ্মরণ হতেই বলল, ও তো নতুন নতুন এডমিশন নিল ৷ এখন পড়া শুনা করতে হবে বেশি ৷ আর তাছাড়া ও স্টুডিয়াস ও মনে হয় ৷

- লেখাপড়া শিখতে এসেছে , স্টুডিয়াস হওয়াই তো দরকার ৷


ছুটির দিন জিনিয়ার গীতি-সন্ধ্যার পরই মাহতাব একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল ৷

মাহতাবের হেলেন ভাবিও বললেন, মেয়েটি সত্যিই জিনিয়াস ৷

মাহতাবের এই প্রথম বারের মতন মনে হল, জিনিয়াকে বিয়ে না করে সে একটা দারুণ ভুল করে ফেলেছে ৷ এমন একটা গুণী মেয়ে মাহতাবকে সেধে সেধে বরণ করতে চেয়েছিল ৷ জিনিয়ার গায়ের রঙটাই যা একটু শ্যামলা, কিন্তু শরীর- স্বস্থ্য দেহের গঠন সবই মাহতাবের কাছে এখন অনন্য হয়ে উঠেছে ৷ গোলাপের পাপড়ির মতন জিনিয়ার পালিশ করা ঠোটে "আর একটি দিন থাকো ৷ হে চঞ্চল যাবার আগে মোর মিনতি রাখো" গানটি শুনে মাহতাবের বারবার মনে হচ্ছিল এই গানটি হয় একদিন তার জন্যেই লেখা হয়েছিল ৷


ফেরবার সময় মাহাতাব ইচ্ছে করেই ষ্কুটার নিল না ৷ ষ্কুটারে শীঘ্র পথ ফুরিয়ে যায় ৷ রিক্সায় গেলে গোটা পথটা সে তাকিয়ে তাকিয়ে উপভোগ করতে পারবে ৷

পাশাপাশি রিক্সায় বসে যেতে যেতে জিনিয়ার শরীর থেকে একটা বিদ্যুৎ শিহরণ মাহতাবের শরীরে বয়ে যাচ্ছিল ৷ হাতের মুঠোয় পাওয়া অথচ নিষিদ্ধ একটা ফলের স্বাদ যেন ৷


জিনিয়া কটাক্ষ করে বলল, এখন এত কাছাকাছি বসলে তো পাপ হবে ৷


- যারা পাপ পুণ্যের কথা ভাবে তাদের বলগে ও কথা, আমাকে নয় তুই জেনে রাখিস ' নগদ যা পাও - হাত পেতে নাও' দালের লোক আমি ৷

জিনিয়া আরেকবার টিটকারী করে বলল, আমাকে তো তোমার তখন পছন্দই হয়নি, এখন আর নগদ কী পাবে?

মাহতাব বলল, তোর মাথায় জিদ না চাপলে হয়ত এখনও পছন্দ হত না! আমি স্বীকার করছি জিনি, তুই সব দিক দিয়েই ইউনিক হয়ে উঠেছিস ৷

জিনিয়া দুটি চোখ বন্ধ করে বলল, আজকে আমার জীবন সার্থক মাতু ভাই ৷ আমার সাধনা আজ সফল হয়েছে ৷ এই কথাটি তোমার মুখে শোনবার জন্যেই তো আমার সারা জীবনের সাধনা ছিল৷


ঘরে ফিরে মাহতাবের বারবার মনে হতে লাগল, মুনীরা জিনিয়ার কাছে একেবারেই মুল্যহীন৷ শুধু মাত্র সে একটা মেয়ে মানুষ এই যা। মাকাল ফলের মত টকটকে লাল ৷ ওর ভেতরে কিছু নেই ৷ ও গান গাইতে জানে না, নাচতে জানে না ৷ রাস্তার হাজার হাজার মানুষের মনে চঞ্চলতা সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতা তার নেই৷ শুধু মাত্র একজন মেয়ে মানুষ নিয়ে যারা সন্তুস্ট থাকতে পারে, তাদের জন্যে ঐ রকম একটা কুনো ব্যাঙ পছন্দসই হতে পারে ৷ কিন্তু যে মানুষের চিত্ত যুগের হাওয়ায় দোলে, শুধু মাত্র নতুনত্বের আস্বাদেই পরিতৃপ্ত, তার কাছে মুনীরার মতন মেয়ে মানুষ একেবারে ইউজলেস ৷



যতক্ষণ মাহতাবের চোখে ঘুম না এল ততক্ষণ ঐ একটি কথাই ওর মনে বারবার অনুরণিত হতে লাগল ৷ মুনীরা শুধু মাত্র একটি মেয়ে মানূষ, তার কাছে এর বেশী কিছু প্রত্যাশা করার নেই ৷ অথচ জিনিয়া সব দিক দিয়েই অতুলনীয় ৷ যদি তার গারে রঙটা আরো একটু উজ্জ্বল হত, তাহলে যাকে বলে ম্যাচলেস হয়ে উঠত ৷


ঘুমন্ত মুনীরার দিকে চোখ পড়তেই তার মনে হল, মুনীরার মুখখানি ভারি সুন্দর, সারল্যে ভরা ৷ এমন মুখ হাজার হাজার মানুষের ভিড়েও মাহতাব কখনো দেখেনি ৷ মায়া হয় মুনীরাকে দেখে ৷ মাহতাবের মনে দৃঢ় ইচ্ছে জাগে ওকে সে গান শেখাবে, নাচ শেখাবে আর মনের মতন করে গড়ে তুলবে ৷ তুলবেই৷


ওর গোঁড়ামী যে করেই হোক মাহতাব ভাঙবেই ভাঙবে ৷

বেলা বারোটা পনের মিনিটে রওশনকে নিয়ে বিশাল একটি জ্যাম্বোজেট আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ল্যান্ড করল ৷ ঘন্টা খানেকের মধ্যেই কাস্টমস চেকিং এর পাট চুকে গেলে ওরা ট্যাক্সি করে বিমান বন্দর থেকে সোজা ঢাকার পথ ধরল ৷ দু' ধারে বিশাল মাঠ, কোথাও সবুজ ক্ষেত, আবার কোথাও বা রুক্ষ কাঁটাবন ৷ ছোট ছোট ঝোপ ৷ নির্জন মাঠে শাস্তি-পাওয়া-পড়ুয়ার মত এক পায়ে এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তাল গাছ আর খেজুর গাছ ৷



রওশন যখন লিবিয়ায় যায় তখন এই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর তৈরী শেষ হয়নি ৷ এটা তৈরীর পর হাজার হাজার একর জমি রাস্তার দুধারে খালি পড়ে আছে ৷ আগে হয়ত জনপদ ছিল ৷ একোয়ার করার পর আগের সে সব দরিদ্র মালিকরা ক্ষতি পুরন নিয়ে এখান থেকে চলে গেছে ৷ বিরান এ মুলুকে নতুন জনপদ গড়ে উঠেছে ৷ উঠেছে বহুতল বিশিষ্ট দালান ৷ এখানে আসবে তারা যাদের আছে অঢেল পয়সা ৷ মাহতাব তাদেরই একজন ৷ উত্তরায় বাড়ির জন্য তারও বড়ো সড়ো একটা প্লট রয়েছে ৷
পথে চলতে চলতে মাহতাব জিজ্ঞেস করল, বোনের বাসায় ওঠার পোগ্রাম করলি যে?


রওশন হেসে বলল, মেজবু তো এখানো একলা থাকেন। দুই মেয়ে ষ্কুলে চলে গেলে মেজবুর বাড়ি একেবারে খালি ৷ ঐ ভাবে থাকতে থাকতে শুনলাম নাকি ওঁর নার্ভাস ডেবিলিটি দেখা দিয়েছে খুব টেনশনে ভোগেন৷

মাহতাব বলল, মেজবু একদিন আমার ওখানে গিয়েছিলেন ৷ দেখলাম চেহারাটা ভারি রোগা রোগা হয়ে গেছে৷ মনে হচ্ছিল শরীরে রক্ত নেই ৷ ভারী ভাল মানুষ, মুনীরা ওঁর খুব প্রশংসা করছিল ৷

- মেজবু চিঠিতে আমাকে সে কথা লিখেছেন। ওঁর চিঠির ভাষাই ছিল আলাদা ৷ লিখেছেন , মাহতাবের বৌটি খুব মিষ্টে মেয়ে ৷ আমাকে দেখা মাত্রই একেবারে আপন করে নিয়েছে ৷

মাহতাব বিরক্তির সাথে বলল, মেজবু দু' একদিন মাত্র দেখেছেন তো ৷

দু'একদিনের দেখাতে কি মানুষ চেনা যায় ?

রওশন অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, কেন রে? বৌ কি তোর পছন্দ না ?

- পছন্দ না হলে অমন কোশিশ করে বিয়ে করলাম কেন?

- তাহলে ও কথা বলছিস যে?

মাহতাব বলল, বৌটার রূপ ছিল বটে, কিন্তু গুন বলতে নেই ৷

No comments: